বাড়ি সম্পাদকীয় অমর একুশ বাংলাভাষাকে ভালোবাসার কথা বলে

অমর একুশ বাংলাভাষাকে ভালোবাসার কথা বলে

149
0

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে – ছিটিয়ে রয়েছে বাঙালী জাতি। এই বাঙালী জাতির মাতৃভাষা হল
বাংলা। বাংলা ভাষায় কথা বলে, গান গেয়ে, কবিতা লিখে ও সাহিত্য, শিল্প – সংস্কৃতি চর্চা করে বাঙালী জাতি যে আনন্দ পায়, সেই আনন্দ অন্য কোন ভাষায় পায় না। কারণ, মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের সমান। মাতৃদুগ্ধ ও মাতৃভাষার বিকল্প আজ পর্যন্ত কখনো হয়নি, হবেও না। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাগুলির মধ্যে বাংলাভাষাকে গণ্য করা হয়। সম্প্রতি, ব্রিটিশ মুলুকে, বাংলাভাষা এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়েছে। ব্রিটিশ মুলুকের রাজধানী লন্ডনে বাংলাভাষাকে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এ খুবই গর্বের কথা। ইংরেজির পরে লন্ডনে সবচেয়ে বেশি মানুষ কথা বলেন বাংলাভাষায়। লন্ডনে বাংলাভাষায় কথা বলেন, এমন মানুষের সংখ্যা ৭১, ৬০৯ জন। এই ফেব্রুয়ারী মাস বিশ্বজুড়ে আপামর বাঙালী জাতির কাছে রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের মাস। ১৯৪৭ সালে জন্ম হয় পাকিস্তানের। পাকিস্তান গঠিত হয়েছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীকে চেনে। তবে, এর পেছনে, যে বিরাট ধারাবাহিক আন্দোলন আছে, তার খবর কজন রাখে? এবার সেই কাহিনী বলবো। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, তমদ্দুন মজলিস
” পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে? বাংলা নাকি উর্দু? ” – নামে একটি বই প্রকাশ করে। যেখানে,
সর্বপ্রথম বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি জানানোর দাবি করা হয়। সেই সময়, সব কিছুতে, কেবল উর্দু ও ইংরেজি ব্যবহৃত হত। এই ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৪৮ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারী, কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত বাঙালী গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পার্লামেন্টে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষাকে
রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার জন্য একটি বিল নিয়ে আসেন৷ ১৯৪৮ সালের ৪-৭ ই মার্চ, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখে, তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির শীর্ষমুখদের নিয়ে তৈরি হয় একটি কমিটি। ১৯৪৮ সালের ১১ ই মার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠার দাবিতে, একটি বড় সমাবেশ আয়োজিত হয়। সমাবেশের শেষে, বের হওয়া মিছিলে, প লিশ বাহিনী চালায় হামলা। ১৫ ই মার্চ, ১৯৪৮ সালে, উর্দুকে, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা করা হয়। যা ছিল মাত্র ৫% মানুষের মাতৃভাষা। এক্ষেত্রে, উপেক্ষিত হয়েছিল পাকিস্তানের প্রায়
৫০% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে, পার্লামেন্টে আরবী হরফে বাংলা লেখার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী, সকাল ৯টার সময়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র – ছাত্রীদের জমায়েত হওয়া শুরু হয়। সকাল ১১টা নাগাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, আলি আহাদ প্রমুখের উপস্থিতিতে সমাবেশ শুরু হয় ছাত্রছাত্রীদের। বেলা ১২ টা থেকে ৩টার মধ্যে, ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের দিকে যেতে শুরু করলে, পুলিশ লাঠিচার্জ করে ও গুলি চালায়। এইসময়, গুলিতে ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন আবুল বরকত, রফিক উদ্দীন এবং আব্দুল জব্বার নামে তরতাজা তরুণেরা। পরে, হাসপাতালে, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আব্দুস সালাম। পুলিশের সাথে ছাত্রদের তুমুল লড়াই হয় ৩ ঘন্টা ধরে। কিন্তু, হাজারো চেষ্টা করেও, পুলিশ ছাত্রদের
মনোবলে এতটুকু চিড় ধরাতে পারেনি। ১৯৫২ সালের এই বাংলা ভাষা আন্দোলন বিশ্বের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। একুশের উৎস থেকে জেগে উঠেছিল গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে, সংগ্রাম উঠেছিল গড়ে। এই সংগ্রাম রক্তঝরানোর ইতিহাসে সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সহ প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে, পথপ্রদর্শকের
ভূমিকা পালন করেছে একুশে ফেব্রুয়ারী। এরজন্যই, আজ গোটা বিশ্ববাসী ” আন্তর্জাতিক
মাতৃভাষা দিবস ” পেয়েছে। এই একুশে ফেব্রুয়ারীকে নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গান, কবিতা সহ নানা অপরূপ সৃষ্টি। ” আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি? ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়া এ ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি? আমার সোনার দেশে রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারী আমি কি ভুলিতে পারি? ” একুশে ফেব্রুয়ারীর এই সুবিখ্যাত গানের সুর দিয়েছেন শহীদ আলতাফ মাহমুদ এবং গানটি লিখেছেন আব্দুল গাফফার চৌধুরী। এই গানটি শুনলে মন – প্রাণ জুড়িয়ে যায় বাঙালী জাতির। আমাদের বাঙালীদের মধ্যে কিছু কিছু মানুষ আছেন, যারা বাংলাভাষাকে খুব হেয় করেন এবং ছোট নজরে দেখেন। তারা এই ভাষাকে ছোট আঞ্চলিক ভাষা বলে বিবেচনা করেন। কিন্তু, তাদের এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। বাংলাভাষা আজ একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক ভাষাতে পরিণত হয়েছে। এই ভাষার ব্যপ্তি ক্রমশ বাড়ছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর, ইউনেস্কো
,২১শে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই পৃথিবীতে আছে একটি দেশ, তার নাম বাংলাদেশ। এই দেশের রাষ্ট্রভাষা হল বাংলা। এখুবই আনন্দের কথা। ইউনেস্কোর মতে, এই বিশ্বের সবচেয়ে মিষ্ট ভাষা হল বাংলা। এই ভাষা আমাদের দেশ ভারতবর্ষের একটি সাংবিধানিক
ভাষা। ২০০২ সালে, পশ্চিম আফ্রিকার একটি ছোট দেশ সিয়েরা লিওন, বাংলাভাষাকে সন্মানসূচক সরকারী ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। মার্কিন মুলুকে, বাংলা ভাষার জয়জয়কার অব্যাহত। পৃথিবীতে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। প্রচলিত ভাষাগুলির মধ্যে মাতৃভাষার বিবেচনায়
বিশ্বে বাংলাভাষার স্থান চতুর্থ। আমরা যারা, বাঙালী, বাংলা ভাষায় কথা বলি, তাদের
কাছে, আমার সবিনয় অনুরোধ, যে, আপনারা বিদেশী ভাষার পদলেহন না করে, নিজের মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলতে হীনমন্যতা বোধ না করে, গর্বের সাথে বাংলাভাষায় কথা বলুন, আর আপনাদেরভবিষ্যত প্রজন্মকে বাংলা ভাষায় কথা বলতে ও বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ব করতে
উৎসাহিত করুন।

তাই, কবির কন্ঠে বলি,
” মোদের গরব,
মোদের আশা,
আ মরি বাংলাভাষা। “
একুশে ফেব্রুয়ারী হল অমর। এই অমর একুশ বাংলা ভাষাকে ভালোবাসার কথা বলে।যতদিন বাঙালী জাতি জীবিত থাকবে, যতদিন বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বজায় থাকবে, ততদিন, শহীদ জব্বার, সালাম, রফিকের বলিদানের ইতিহাসে সমৃদ্ধ অমর একুশকে বিশ্ববাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে করবে স্মরণ, করবে স্মরণ,
করবেই স্মরণ।

Loading...