বাড়ি সম্পাদকীয় ভারতবন্ধু করিমা

ভারতবন্ধু করিমা

48
0

রবীন্দ্রকুমার শীল
স্বাধীন বালুচিস্তান গড়তে যারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন করিমা। করিমার স্বপ্ন ছিল সে একদিন স্বাধীন বালুচিস্তান দেখতে পাবে। সেই কারণে সে বালুচিস্তানে পাক সেনার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। পাক সেনারা স্বাধীনতাকামী বালুচ দের ধরে ধরে জেলে পুরছে এবং কোনও কোনও সময়ে গুপ্তভাবে তাদেরকে মেরে ফেলা হচ্ছে। বালুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা নিয়ে বিশ্ব ্প্রতিবাদ করলে তাতে কর্ণপাত করছে না পাকিস্তান ্প্রশাসন। পাকিস্তান ্প্রশাসন থেকে বারবার বলা হয়েছে যে বালুচিস্তান বিষয়টা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন বিষয় । এটার মধ্যে কারোর নাক গলানোর ্প্রয়োজন নেই। ভারতের দিকে তাক করে বারবার পাকিস্তান হুঁশিযারী দিয়েছে । পাকিস্তান থেকে বলা হয়েছে যে ভারতের গুপ্তচর সংস্থা র বালুচদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছে। স্বাধীন বালুচিস্তান গড়তে সেখানকার তরুণদের সেনা ্প্রশিক্ষণ দিত ভারত। ভারত থেকে বারবার একথা অস্বীকার করা হলেও পাকিস্তান তা শুনতে নারাজ। ভারত কে বলা হয়েছে কোনও দেশের অভ্যন্তরীন বিষযে ভারত নাক গলায় না। কিন্তু যদি কেউ বিপদে পড়লে ভারতে সাহায্য চায় তাহলে ভারত তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ভারত এখনও বালুচিস্তান নিয়ে কোনও চিন্তাভাবনা করেনি। সেখানকার বহু তরুণরা পাক সেনার দ্বারা অত্যাচারিত হযে ভারতের সাহায্য চেয়েছে । কিন্তু ভারত তাদেরকে কোনও রকম সাহায্য দিতে পারেনি তার একটি মাত্র কারণ হচ্ছে এটা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন বিষয় বলে। উপরন্তু কিন্তু পাকিস্তান ভারতের অভ্যন্তরীন বিষযে নাক গলাতে শুরু করে দিয়েছে । তারা একটি সময়ে কাশ্মীর নিয়ে যেভাবে সেটাকে আন্তর্জাতিক ইসু্যতে পরিণত করেছিল সেটা কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীন বিষয়ে সামিল হওয়ার ব্যাপার। বহুবার পাকিস্তান সরকারকে এ ব্যাপারে হঁশিযারী দিলেও পাকিস্তান শান্ত হতে পারেনি।
কাশ্মীর সীমান্তে বারবার পাকিস্তান সেনারা হামলা করে এসেছে। কাশ্মীরে জঙ্গী পাঠিয়ে সেখানকার পরিবেশকে বিষাক্ত করেছে। এমনকী একটি সমযে কাশ্মীরের রাজনীতির মধ্যে পাকিস্তান অংশ গ্রহণ করতে শুরু করে দিয়েছিল। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ্প্রশ্রয দিতে শুরু করে দিয়েছিল। ভারতের কাশ্মীরে পাকিস্তান দিবস পালন করার ব্যাপারে উত্সাহ দিত পাকিস্তান। সেখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে অর্থ থেকে শুরু করে অস্ত্রদেওযার ব্যবস্থা করেছিল পাকিস্তান। গোটা কাশ্মীরের ্প্রশাসন একটি সময়ে পাক মদতপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা পরিচালিত হতো। সেটা এখন একেবারে দমন করে দিয়েছে মোদি সরকার। মোদি সরকার এসেই কাশ্মীরকে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করার ফলে পাকিস্তান আর কাশ্মীর নিযে কোনও কথা বলতে পারছে না। পাকিস্তানের বিদেশ নীতি ছিল শুধু মাত্র কাশ্মীর। কাশ্মীরকে সমানে রেখে দিযে পাকিস্তান একটি সমযে আন্তর্জাতিক দরবার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতো। এমনকী পাকিস্তান ভারত দ্বারা আক্রান্ত এই অজুহাত খাড়া করে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মহল থেকে বহু টাকা তুলেছে। সেই সব পরবর্তীকালে ভুযোতে পরিণত হওযার ফলে এখন আর আন্তর্জাতিক মহল থেকে কোনও রকম সাহায্য পাচ্ছে না। পাস্তিকানের সবচেযে বড় বন্ধু ছিল আমেরিকা। সেই আমেরিকা এখন পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব গ্রহণ করতে শুরু করে দিয়েছে । ভারত পাক যুদ্ধের সমযে আমেরিকা পাকিস্তানকে সাহায্য করেছিল। সেই সমযে রাশিযা ভারতের পাশে থাকার ফলে আমেরিকা কোনও রকমভাবে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সাহস পায়নি। কিন্তু বরাবরই পাকিস্তান চেষ্টা করেছে বৃহত্ শক্তিকে ভারতের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে। সেটা সম্ভব হয়নি বলে আজকে পাকিস্তান বেশ ক্ষিপ্ত। চিনকে ভারতের বিরদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার পিছনেˆ পাকিস্তানের আইএসআই কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে । লাদাখ এবং অরুণাচল সীমান্তে যে সব সীমান্ত নিয়ে চিনের সঙ্গে ঝামেলা হচ্ছে তার পিছনে মদত দিচ্ছে পাকিস্তানের আইএসআই। তারা চিনকে ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত করতে শুরু করে দিয়েছি । চিনকে দিয়ে ভারতকে ঠাণ্ডা করার কৌশল অবলম্বন করার চেষ্টা করছে। চিন কোনও রকমভাবে ভারত আক্রমন করতে ইচ্ছা ্প্রকাশ করছে না। কিন্তু যেভাবে পাকিস্তানের আইএসআই চিনকে ভারত বিরোধিতা করতে উত্সাহিত করছে তাতে আগামি দিনে চিন ভারত কূটনীতি কোনও অবস্থায় থাকে সেটা চিন্তার বিষয় । বর্তমান মোদি সরকার জানে পাকিস্তান নামক দেশটা যতদিন মানচিত্রে থাকবে ততদিন ভারতকে বিরক্ত করতে থাকবে। ভারতকেনিশ্চিতভাবে বসবাস করতে গেলে পাকিস্তানের শক্তিকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওযার ্প্রযোজন রয়েছে । ভারত পাকিস্তানকে বন্ধু রাষ্ট্র বলে ভাবতে পারছে না তার একটি মাত্র কারণ হচ্ছে কাশ্মীর ইসু্য। ভারতে কাশ্মীর অন্তর্ভুক্তি সমযে পাক সেনারা হঠাত্ করে কাশ্মীর আক্রমণ করে বেশ কিছুটা দখল করে নিযয়েছিল। কাশ্মীর ভারতের অংশ হিসাব পরিগণিত না হতে পারে তার জন্য তারা চিরকালই চক্রান্ত করে এসেছে। কাশ্মীরে জঙ্গিদের আর্থিক সহাযতা করা ছাড়া তাদেরকে অস্ত্র দেওয়া থেকে শুরু করে সামরিক ্প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে দিয়েছিল। কাশ্মীরটাকে ভারতে থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই সব কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করে পাকিস্তান ্প্রশাসন।
ভারতের সঙ্গে বারবার সম্মুখ সমযে উপস্থিত হলে পাকিস্তান জিততে পারেনি। সেই কারণে তারা সন্ত্রাসবাদী হামলা করে ভারতকে দুর্বল করে দিতে চায় । মম্বুইযে দাউদ ইব্রাহিম পাকিস্তানের এজেন্ট ছিল। সেটা ভারতের গোয়েণদা জানতো। কিন্তু দাউদ ভারতের নাগরিক থাকার অতি সহজে তাকে গ্রেফতার করা একেবারে অসমম্ভব হচ্ছিল। আবার দাউদ ইব্রাহিম যেভাবে তার ব্যবসার নেট ওযার্ক সারা ভারত জুড়ে ছড়িযে রেখে দিয়েছিল তাতে হঠাত্ করে তাকে গ্রেফতার করলে ভারতের অর্থনীতির বিরুপ ্প্রতিক্রিয়া এসে পড়তে পারে বলেই খুব ধীর গতিতে কেন্দ্রীয় সরকার দাউদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে থাকে। সুযোগ এসে যায় । শিবসেনার ্প্রধান বাল ঠাকরে এসে দাউদকে একেবারে দেশ ছাড়া করে দিয়েছিল। এমনভাবে কৌশল করে দাউদের সব অন্ধকার সাম্রাজ্যকে গ্রাস করে নিয়ে ছিল ভারত সরকার তাতে দাউদের পাকিস্তানে আশ্রয গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল না। দাউদ মনে করেছিল যে পাকিস্তান থেকে ভারতের ওপরে দাদাগিরি চালাবে। সেটা আর বেশি দূর করা সম্ভব হয়নি। কারণ দাউদের সব সাপ্লাই লাইন কেটে দিয়েছিল ভারতের গোয়েণদারা। ফলে দাউদকে এখন গা ঢাকা দিয়ে চলতে হচ্ছে। এদিকে ভারতের হযে ইন্টারপোল দাউদকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছে। ইটারপোল চেষ্টা করছে দাউদকে গ্রেফতার করতে। কিন্তু দাউদ কোনও স্থানে একদিনের বেশি থাকে না। সে দুবাই থেকে শুরু করে সারা ইসলাম দেশগুলো ঘুরে বেড়ায় । পাকিস্তানেও বেশি দিন থাকে না। দাউদকে গ্রেফতার করে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তান কোনও রকমভাবে আগ্রহ ্প্রকাশ করছে না বলে ভারত বারবার আন্তর্জাতিক আদালতে নালিশ জানালেও পাকিস্তান এ সব ব্যাপারে তোযাক্কা করছে না।
এদিকে বালুচিস্তানে পাক সেনা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন করিমা। 2015 সালে বিবিসি তাঁকে ্প্রভাবশালী একশো জনের মধ্যে স্থান দিয়েছিল। ভারতের ্প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বার্তা দিয়েছিলেন, আপনাকে নিজের দাদা বলে মনে করি। ছোট বোন হিসাবে চাইছি বালুচিস্তানে পাক সেনার গণহত্যা, লাগাতার যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষযটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরুন।’ গত বছরই তিনি ইমরান খানের নৃশংসতার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছিলেন। বরাবর স্বাধীন বালুচিস্তানের দাবিতে সরব সেই খ্যাতনামা সমাজকর্মী করিমা বালোচের রহস্যজনক মৃতু্য হল কানাডায। গতকাল টরন্টোর হারবারফ্রন্ট উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তাঁর দেহ। অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইযে দিকেই। তাদের নেত্রী এমন রহস্যজনক মৃতু্যতে চল্লিশ দিন শোকপালনের কথা ঘোষণা করেছে স্বাধীন বালুচিস্তানের দাবিতে আন্দোলনরত ‘বালোচ ন্যাশনাল মুভমেন্ট’। পঁযত্রিশ বছরের করিমাকে দেখতে পাওযা গিয়েছিল রবিবার বিকেলে। বালোচ নেতা নেত্রীদের দাবি আইএসআইকে দিযে রীতিমতো ছক কষে তাকে মেরে ফেলেছে ইমরান খানের সরকার। কানাডার মাটিতে আইএসআই কার‌্যকলাপ নিষিদ্ধ করতে আর্জি জানিয়েছে সে দেশের ্প্রধানমন্ত্রী জ্যাস্টিন ট্রুডোকে। পাক সেনার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে কানাডায আশ্রয গ্রহণ করেছিলেন করিমা 2016 সালে। তার আগে তিনি দীর্র্ঘদিন গা ঢাকা দিয়েছিলেন। তিনি বালুচিস্তান স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশন (আজাদ) এর হাত ধরে সক্রিয রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করতে শুরু করে দিয়েছিলেন। সেই স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশনকে পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছে। সংগঠনের ্প্রথম চেযারপার্সন ছিলেন করিমা। দেশ ছাড়লেও করিমা লড়াই ছেড়ে দেননি। কানাডার শরনার্থী হযে তিনি ভারতের ্প্রধানমন্ত্রীকে লিকেছেন, ‘বালুচিস্তানে গণসংহার চালাছে ইমরান সরকার। এখানে কত ভাইবোন আলাদা হযে গিয়েছেন, তার কোনও হিসাব নেই। আমার মতো অনেক বোন এখন তাদের ভাইদের ফেরার অপেক্ষা করেন। দয়া করে আপনি আমাদের হযে বালুচিস্তানের দুর্দশার কথা বিশ্ববাসীকে জানান।’ এরপরে তিনি একটি সাক্ষাত্কারে বলেছেন, বর্হিজগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে বালুচিস্তানে অকথ্য অত্যাচার চালাচ্ছে পাক ্প্রশাসন। সেই বছর তিনি সুইজারল্যাণ্ডে রাষ্ট্রপুঞ্জের অধিবেশনে তিনি ইমরান খানের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। তাই করিমার রহস্যজনক মৃতু্যর পিছনে পাকিস্তানের হাত রয়েছে মনে করা হচ্ছে। টরন্টোর উপকূল থেকে দেহ উদ্ধার করার পর করিমাকে শনাক্ত করেন তাঁর স্বামী এবং এক ভাই। এই ঘটনা ভারতের ্প্রধানমন্ত্রীকে বিচলিত করে দিয়েছে । যদি এ ব্যাপারে ভারতের ্প্রধানমন্ত্রী মোদি একটি কথাও বলেনি। তবে এটা ঠিক ভারতের বর্তমান ্প্রধানমন্ত্রী মোদি কোনও কথা কারোর হযে বেশি বলেন না। তিনি ্প্রায সমযে নীরব থাকেন বটে। কিন্তু তা বলে তাঁক কাজ থেমে থাকে না। সেটা কথার চেযে বেশি জোরে চলতে থাকে। এটাই হচ্ছে মোদির আসলি দর্শন। কথা কম কাজ বেশি।

Loading...