বাড়ি অন্যান্য ব্যঙ্গ চিত্র শিল্পী চণ্ডি লাহিড়ি: রবীন্দ্রকুমার শীল

ব্যঙ্গ চিত্র শিল্পী চণ্ডি লাহিড়ি: রবীন্দ্রকুমার শীল

992
0
aloke kumar <newsdailydurantabarta@gmail.com>2:33 PM (25 minutes ago)
to me

‘এতো বঙ্গ ভঙ্গ তৱু রঙ্গে ভরা’ কবিতার লাইনটি এখনও বহুজনের মুখে মুখে ঘোরাফেরা করে। বঙ্গদেশে রঙ্গ থাকবে না তা কখনও হয। বঙ্গের সঙ্গে রঙ্গ শব্দের বেশ মিল রযেে। বিখ্যাত রম্য রচনাকার সৈযদ মুজতবা আলি বলেছিলেন, রঙ্গ হচ্ছে বাঙালি জীবনের অঙ্গ। একটি অন্যতম ্প্রাণ্প্রদীপ যা সব সমযে জ্বলতে থাকে। কখনও নেভে না। লেখক সৈযদ মুজতবা আলি কিংবা গৌরকিশোর ঘোষ যেভাবে রম্যরচনা সৃষ্টি করে আপামর বাঙালিদের হাসিযে দিযে গিযেিলেন সেখানে বাংলার কৌতুক চিত্রশিল্পী এক কথায বলা যেতে পারে কার্টুন বা ব্যঙ্গ চিত্রশিল্পীরা বহু কাল ধরে বাঙালি মনন জীবনের খোরাক জুগিযেিলেন। এক সমযে বাংলা সংবাদপত্রের ্প্রথম পাতায ব্যঙ্গচিত্র ্প্রকাশিত হতো গুরুত্বপূর্ণ কোনও ঘটনাকে অবলম্বন কৰে। সেটা সেই ধারাটা এখন আর নেই বলতে গেলে চলে। বাংলার চিত্র জগতে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ কিছু কৌতুক ছবি অঙ্কিত করেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ব্যঙ্গ চিত্র অঙ্কিত করেন। আসলে এই সব চিত্র কিন্তু একটি সমযে চিন্তাধারাকে ্প্রকাশ করে। বা কোনও বিষযে বিরুদ্ধে ্প্রতিবাদ স্বরূপ ্প্রকাশিত হতো। তবে বহু ক্ষেত্রে দেখা গিযেে যে ব্যঙ্গ চিত্র ্প্রতিবাদের চিত্র। সেটা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ্প্রতিবাদও হতে পারে। বর্তমান বহু রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ব্যঙ্গচিত্র আত্মশ্লাঘা ছিল। রাজ্যের ্প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে নিযে বহু কার্টুন অঙ্কিত হযেে। এমনকী তাঁকে নিযে ব্যঙ্গচিত্রের একটি  ্প্রদর্শনীর আযোজনও হযেিল আকাদেমিতে। সেই ব্যঙ্গচিত্র ্প্রদর্শনীর উদবোধন করেন মুখমন্ত্রী জ্যোতি বসু স্বযং। সাংবাদিকেরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনাকে নিযে ব্যঙ্গচিত্র ্প্রদর্শনীর কেমন উপভোগ করলেন । জ্যোতি বসু বলেছিলেন- দারুণ। সম্ভবকে একেবারে অসম্ভবে পরিণত করা হযেে। আমি যে ব্যঙ্গচিত্র শিল্পীদের বিষযবস্তু হযে উঠতে পারি সেটা ্প্রদর্শনী দেখে উপলব্ধি করতে পারলাম। বাংলার ব্যঙ্গ চিত্র শিল্পীরা আমার বিভিন্ন দিকের চিত্র অঙ্কিত করে আরও আমাকে আরও ব্যক্তিত্বময করে তুলেছে। ধন্যবাদ বঙ্গের ব্যঙ্গচিত্র শিল্পীদের। তাঁদের চিন্তা ও তুলির দক্ষতার ্প্রশংসা আমাকে করতেই হবে।  এইসব শিল্পীদের মধ্যে ইদানিং আমরা যাঁকে হারালাম তিনি হচ্ছেন চণ্ডি লাহিড়ী। তিনি বাংলার ব্যঙ্গ চিত্রে ঘরানা নিযে কাজ করেছিলেন। তাঁর ব্যঙ্গ শিল্প জীবনে গুরু ছিলেন পিসি লাহিড়ি ( ্প্রফুল্লচন্দ্র লাহিড়ি)। তিনি বহু রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে দেখেছেন। সেই জন্য রাজনৈˆতিক কার্টুনে একজন  দুঃসাহসিক শিল্পী হতে পেরেছিলেন। আর একজন শিল্পী শৈল চক্রবর্তী। তুলি এবং নিব দিযে তিনি ছবি আঁকতেন। টেনিদার অঙ্কিত চিত্রগুলি চিরকাল তাঁকে অমর করে রাখবে। শিল্পী রেবতীভূষণ ঘোষ ছোটদের চালচলন, জন্তু জানোযার এবং পাখির চিত্র অঙ্কনে সর্বভারতীয ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ছিলেন। অমল চক্রবর্তী ও কার্টুন অঙ্কনে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। কার্টন হচ্ছে একটি স্বাধীন শিল্প। আনন্দদান এবং কঠিনবস্তুকে সহজে ্প্রকাশ করার মুশকিল আসান ।  গল্পের বা ছড়ার অলংকরণ, যতই মজার হোক সেটা কার্টুন নয বলে মনে করতেন চণ্ডী লাহিড়ী। তিনি মনে করতেন, রাজনীতিকদের ভুল ধরিযে দেওযা, অতীতে বিশ্ব ইতিহাস ঘেঁটে কোনও রাজনীতিকের ভাগ্যে ঘটেছিল সেটা স্মরণ করিযে দেওযা। পেট্রলের দাম যেমন শিল্পীকে অাঁকতে হয ঠিক তেমনি তাঁকে আবার কেন দাম বাড়ল তাও মনে রাখতে হয। কার্টুনিস্ট পেট্রলের দাম বাড়লে দুঃখী মানুষদের পাশে এসে দাঁড়ায। অন্যায নীতি এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তুলি ধরাই হচ্ছে কার্টুনিস্টদের আসল কাজ। বাংলার কার্টনিস্ট জগতকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন অনুপ রায এবং দেবাশিষ দেব। অনুপ রায দেশ পত্রিকার মলাটে যেসব রাজনৈতিক কার্টুন অঙ্কিত করেছেন তা একেবারে মৌলিক। ব্যঙ্গচিত্র শিল্পী চণ্ডী লাহিড়ী ছিলেন নবদ্বীপের বাসিন্দা। নবদ্বীপে তাঁর জন্ম হযেিল বলে তিনি খুব গর্ব অনুভব করতেন। সেখানে চৈতন্যদেবের জন্মস্থান। চৈতন্যদেব ্প্রথম জীবনে শাক্ত ছিলেন। পরে তিনি বৈষ্ণব ধর্ম ্প্রচলন করেন বাংলায। কার্টুন চিত্র শিল্পী চণ্ডী লাহিড়ী ্প্রথম জীবনে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। গুপ্ত সমিতিতে যোগদানও করেন। বোমা তৈরি করতে গিযে তাঁর বাঁ উড়ে যায। সেই থেকে তিনি ডান হাত দিযে বাংলার ব্যঙ্গ চিত্রকে সম্পদশালী করেছেন।  শিল্পী চণ্ডী লাহিড়ী নবদ্বীপ থেকে কলকাতায চলে আসেন ভাগ্যান্বেষণে। ্প্রথমে তিনি অতুল্য ঘোষের ‘লোকসেবক’ পত্রিকায যোগদান করেন। সেখানে কাজ করার সমযে বিখ্যাত সাংবাদিক সন্তোষ কুমার ঘোষের নজরে পড়ে যান। চলে আসেন আনন্দবাজারে। সাব এডিটর হিসাবে তিনি দৈনিক ‘লোকসেবক’ পত্রিকায কাজ শুরু করলেও তিনি আনন্দবাজারে এসে কার্টুন আঁকতে শুরু করলেন। বলা যেতে পারে তিনি অসাধ্য সাধন করলেন। আনন্দবাজারের ্প্রথম পাতায তির‌্যক না দেখে বহু পাঠকেরা অন্য খবরে যেতেন না। এমনই ছিল তাঁর কার্টুনের গুণ। সামাজিক বিষয কার্টুন আঁকার পাশাপাশি তিনি বহু রাজনৈতিক কার্টুনও এঁকেছেন। চণ্ডী লাহিড়ীর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিযে যুগান্তর পত্রিকার বিখ্যাত কার্টুনিস্ট অমল চক্রবর্তী বলেছিলেন, চণ্ডীদা কোনও আর্ট কলেজে গিযে ছবি আঁকার শিক্ষা গ্রহণ করেন নি। এটি ছিল  তাঁর সহজাত ্প্রতিভা। বিভিন্ন মানুষের ছবি নিযে ব্যঙ্গাত্মক আলোচনার সূত্র ধরে তাঁদের ছবি অাঁকাৰ সূত্রপাত। চণ্ডী লাহিড়ী, কুট্টি, হিমানীশˆ গোস্বামী ্প্রমুখের একটি আড্ডা উত্তর কলকাতায বসতো। কুট্টি ছিলেন ্প্রবাসী ভারতীয। চণ্ডী লাহিড়ী যখন রাজনৈতিক কার্টুন আঁকতে শুরু করলেন তখন আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠী কুট্টিকে দিযে বেশি রাজনৈতিক কার্টুন আঁকাতে শুরু করলো। কিন্তু তাতে কোনও রকমভাবে মানসিক কষ্ট পাননি চণ্ডী লাহিড়ী। পরবর্তীকালে কুট্টি ‘আজকাল’ পত্রিকায যোগদান করেন। পশ্চিমবঙ্গে যেমন জন্প্রিয ছিলেন চণ্ডী লাহিড়ী ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও সমানভাবে জন্প্রিয ছিলেন। তাঁর কার্টুন দেখে শিল্পীর ্প্রেমে পড়েনি এমন লোকের সংখ্যা ্প্রায বিরল বলা যেতে পারে। বহু সুন্দরী মহিলা তাঁকে বিবাহ করার জন্য আগ্রহ ্প্রকাশ করেছিলেন বলে বাংলার হাস্যরসের ্প্রিয লেখক শিবরাম চক্রবর্তী মন্তব্য করেছিলেন। স্বযং শিবরাম একবার চণ্ডী লাহিড়ীর জন্য পাত্রী ঠিক করে ফেলেছিলেন। চেতলার তেজেভাজাওযালির মেযেে দেখে পচ্ছন্দ করেন  শিবরাম চক্রবর্তী। এই মেযেির সঙ্গে চণ্ডীকে বেশ মানাবে বলে শিবরাম বিযে ্প্রস্তাব পেশ করলে সেই রাস্তায দিযে একেবারে হাঁটা বন্ধ করে দেন শিল্পী চণ্ডী লাহিড়ী। বহু কষ্টে সেই ভূত তাড়াতে পেরেছিলেন। শিবরামের হাত থেকে রেহাই পেতে তাঁর সঙ্গে রাস্তা দিযে হাঁটা পর‌্যন্ত বন্ধ করে দিযেিলেন কার্টুন শিল্পী।চণ্ডী লাহিড়ীর কার্টুন শুধু সংবাদপত্রে বা বইযে মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না নয, বৈদু্যতিন মাধ্যমগুলোতেও তিনি ছিলেন সমানভাবে স্বচ্ছন্দ। কলকাতা দূরদর্শনে অভিজিত দাশগুপ্তের ্প্রোগ্রামে যেখানে বিখ্যাত ছড়াকার এবং সাংবাদিক অমিতাভ  চৌধুরী অনর্গল নতুন নতুন ছড়া বলতেন আর সঙ্গে সঙ্গে তাকে কার্টুন ছবিতে রূপান্তরিত করতেন চণ্ডী লাহিড়ী। পরবর্তীকালে বৈদু্যতিন মাধ্যমে তাঁর কার্টুন ভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘চণ্ডীপাঠ’ খুব জন্প্রিয হযেিল। কার্টুন নিযে সেই সমযে কোনও ভালো বই ছিল না। চণ্ডী লাহিড়ী সেই অভাব পূরণ করেছিলেন। তিনি কার্টুন নিযে একটি গবেষণা গ্রন্থ ‘কার্টুনের ইতিবৃত্ত’ রচনা করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গণমাধ্যম এই বইটি ্প্রকাশ করেছিল। গণমাধ্যমের তত্কালী চেযারম্যান হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায এই বইযে ভূমিকায লিখেছিলেন,‘ ভারতীয কার্টুন তো এখন সাবালক। হলে কি হবে- কী এদেশে কী ওদেশে এই নিযে তথ্যনিষ্ঠ আলোচনা হয নি। এই অভাব পূরণের জন্য ্প্রবীণ কার্টুনিস্ট চণ্ডী লাহিড়ী দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রহ করে যাচ্ছিলেন বিশ্বসেরা, অধুনা দুর্লভ অংসখ্য কার্টুন। ‘কার্টুনের ইতিবৃত্ত’ সেই ্প্রযাসের ফসল।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘কিছুকাল ধরে বাঙালির ব্যঙ্গচিত্রকরের ্প্রভাব যেন কমে এসেছে। এসব দেখে আমার মতো অনেকেরই খুব খারাপ লাগে। চণ্ডীবাৱু ্প্রায যেন একা কুম্ভের মতো লড়াই চালাচ্ছেন। হীরেনবাৱু এই উক্তি যে আজ কতখানি সত্য তা এখন আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। চণ্ডী লাহিড়ী 2018 সালে 18 জানুযারি ্প্রযাত হন। তাঁর পরলোকগমনের মধ্যে দিযে কার্টুন জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো বলা যেতে পারে। বাঙালিরা আজকে হাসতে ভুলে গেছে। হৃদয ভরে মন খোলা হাসি আর হাসতে পারছে না। একটা গুমোট ভাব জমা হযেে সর্বত্র। বড়ই কঠিন জীবন। সেই কঠিনকে ব্যঙ্গ রস দিযে রসালো করার শিল্পী সংখ্যা একেবারে তলানিতে এসে দাঁড়িযেে। গুটি কযে এখনও জীবিত। তাঁদের হৃদস্পন্দন চলছে বটে। তবে যে কোনও দিন একেবারে স্তব্ধ হযে যেতে পারে। বাংলা রম্যরচনা যেমন এখন যেমনএকটি বিরল সাহিত্যে পরিণত হযেে ঠিক তেমনি ব্যঙ্গচিত্রও বিরল থেকে বিরলতম জাযগায স্থান গ্রহণ করার পথ ধরে এগিযে চলছে। আর নতুন করে বাংলায কোনও কার্টুনশিল্পীর আবির্ভাব হচ্ছে না। কার্টুন জগতে সৃষ্টি হযেে বিরাট শূন্যতা। তাকে পূরণ করার মতো দক্ষ সমাজদার শিল্পী তৈরি হচ্ছে না বলতে গেলে চলে। অ্যানমেশন কিছুটা সেই অভাব পূরণ করছে বটে। কিন্তু সেটা কতদিন টিঁকবে তা বলা যাচ্ছে না। টিভিতে অ্যানিমেশন ছোটদের কাছে জন্প্রিয হচ্ছে। কিন্তু বইযে মধ্যে দিযে অ্যানিমেশনের ্প্রকাশ হলেও তা কিন্তু মনেরি চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।

Loading...