বাড়ি সম্পাদকীয় বিধানসভার নির্বাচনী তর্জা পশ্চিমবঙ্গে জমে উঠেছে

বিধানসভার নির্বাচনী তর্জা পশ্চিমবঙ্গে জমে উঠেছে

58
0

রবীন্দ্রকুমার শীল

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনী তর্জা জমে উঠেছে। এবার বিজেপি বনাম তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট যুদ্ধ হবে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রণক্ষেত্রে। সেই ্প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করে দিয়েছে  দুই রাজনৈতিক শিবির। দুটি রাজনৈতিক দল এখন থেকেই নির্বাচনী কৌশল গ্রহণ করার পথ ধরে এগিযে চলতে শুরু করে দিয়েছে। বিজেপির মূল লক্ষ্য হচ্ছে গ্রাম বাংলা। গ্রাম বাংলা ধরেই এখন বিজেপি নির্বাচনী ্প্রচার করতে শুরু করে দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস এখন শহর ভিত্তিক নির্বাচনী ্প্রচার চালাচ্ছে। গ্রাম ভিত্তিক নির্বাচনী ্প্রচার করবেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায। তিনি জনগণের সঙ্গে মিশে রাজনৈতিক আন্দোলনটা ভালো করতে পারেন। এটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যাযে অন্যতম ভোট কৌশল বলা যেতে পারে। কীভাবে কোনও কর্মসূচি গ্রহণ করলে জনগণ বেশি করে আকর্ষিত হবে সেটা নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায ভালো করে জানেন বলেই শক্তিশালী বামফ্রন্টকে সহজেই পরাস্ত করতে পেরেছিলেন। বামফ্রন্ট যেভাবে শিল্পনীতিকে গ্রহণ করেছিল তাতে আতঙ্কিত হয়ে  পড়েছিল কৃষকেরা। কৃষকেরা বামফ্রন্টকে সমর্থন করার পথ পরিত্যাগ করে সকলেই তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করতে শুরু করে। কৃষকদের ওপরে নির্ভর করে তৃণমূল কংগ্রেস সামনে দিকে এগিয়ে চলতে শুরু করলে সেটাকে ্প্রতিরোধ করতে পারেন নি বামফ্রন্টের নেতারা। পশ্চিমবঙ্গের কৃষকেরা সবাই এক যোগে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করার ফলে বামফ্রন্টের পরাজয ঘটে। কৃষি আমাদের ভিত্তি শিল্প আমাদের ভবিষ্যত এই স্লোগান নিযে বেশি দূর যাওয়া  সম্ভব নয সেটা পরিস্কার হযে গিয়েছিল। ফলে বামফ্রন্টকে পরাস্ত স্বীকার করতে হয়। বামফ্রন্টের নেতারা কিছুতেই কৃষকদের বোঝাতে পারেনি যে তাদের জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে যে শিল্প স্থাপন করা হবে তাতে গ্রামের শিক্ষিত বেকারদের চাকরি দেওযার সুযোগ করে দেওইয়া  হবে। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প স্থাপন করার ্প্রযোজন রয়েছে ।

কৃষি যেমন পশ্চিমবঙ্গের ্প্রয়োজন আবার শিল্পও ্প্রয়োজন। বহু বছর অতিক্রান্ত  হয়েছে গিয়েছে  পশ্চিমবঙ্গে কোনও শক্তিশালী শিল্প স্থাপন করা যায়নি। শক্তিশালী  শিল্প স্থাপন করতে গেলে ্প্রয়োজন হচ্ছে জমি অধিগ্রহণ। কৃষকেˆদর জমি অধিগ্রহণ করতে গিযে বামফ্রন্ট ঝামেলা সৃষ্টি করে দিয়েছিল। কৃষকেরা বামফ্রন্ট বিরোধী হয়ে  উঠেছিল। সেই সময়ে ্প্রয়োজন ছিল বিক্ষুব্ধ কৃষকদের সঙ্গে বাম সরকারের  আলোচনা করা। কিন্তু সেটা না করে শক্তি দেখিযে কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে ক্ষমতাকে সঁপে দিল বলা যেতে পারে। তৃণমূল  কংগ্রেস সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে  বাম সরকার বিরোধী পরিবেশ গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিল। আজকে কিন্তু রাজ্যে নতুন করে কৃষক সমস্যা নেই। নতুন করে শ্রমিক সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। ফলে নির্বাচনী হাতিযার কাকে করা হবে তা এখন ৱুঝতে পারা সম্ভব হচ্ছে না। বোলপুরে গিয়ে দেখতে পাওযা গেল সেখানে শান্তিনিকেতনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হতে শুরু করে দিয়েছে। বোলপুরে বিশ্বভারতীকে সামনে রেখে শুরু হয়েছে কেন্দ্র রাজ্য তর্জা। কবিগুরু শান্তিনিকেতন এখন রাজনৈতিক দলে হাতিযারে পরিণত হয়েছে। বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের টানাপোড়েনে বিশ্বভারতীর অবস্থা একেবারে কাহিল বলা যেতে পারে। ভাগ্য ভালো যে করোনাভাইরাসের ফলে বিশ্বভারতীযর ক্যাম্পাস বন্ধ। বিশ্বভারতীতে পঠনপাঠন থাকলে সেখানে রাজনৈতিক তর্জার ্প্রভাব পড়তো এটা নিশ্চিত করে বলে দেওযা যেতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ বিশ্বভারতীতে গেছেন। সেখানে গিযে তিনি কবিগুরুর ্প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তারপরে বিশ্বভারতীর শতবর্ষ অনুষ্ঠানে দেশের ্প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভার্চুযাল বক্তব্য রেখেছেন। বিশ্বভারতী থেকে বলা হয়েছিল যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল।  আবার মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি নাকি আমন্ত্রণপত্র পাননি। বিশ্বভারতী থেকে বলা হয়েছিল আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় । আবার মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন , কে এবং কবে আন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছে তা তাঁর জানা নেই। বিশ্বভারতীকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তর্জার পরিবেশ যে গড়ে উঠবে সেটা পরিস্কার হযে যেতে শুরু করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ বোলপুরে রোড শো করে ছিলেন। সেই রোড শো’তে জনসমাবেশ হতে দেখা যায়। ফলে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীও রোড শো করবেন এটা স্বাভাবিক।  বোলপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায রোড শো করে বিজেপির দিকে যে একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন সেটা পরিস্কার। রোড শো করে তিনি বিজেপিকে বাংলা থেকে ভোকাট্টা করে দেওয়ার ডাক দিলেন। নেত্রী বলতে  লাগলেন, এ বার দানবের সঙ্গে লড়াই হবে মহামানবের। এরা (বিজেপি) বাংলাকে দখল করতে এসেছে। বাংলার মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চক্রান্ত করছে। বাংলাকে   বাঁচান। ভোকাট্টা করে দিন।’। বিজেপি সঙ্গে এবারে তৃণমূল কংগ্রেস একেবারে সামনা সামনি লড়াই করার পরিবেশ সৃষ্টি করে দিলেন নেত্রী। এতদিন ধরে বিজেপির সঙ্গে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী লড়াই চলছিল পরোক্ষভাবে। এবারে সম্মুখ লড়াই শুরু হযে গেল। দলত্যাগের পালা শুরু হযে গিয়েছে কযে মাস আগেই। দলত্যাগী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যে বেশ কযেটি জনসভায বিজেপি দলের হযে বক্তব্য রেখেছেন। তিনি আবার সংগঠন তৈরি করতে জানেন। কীভাবে সংগঠনকে চাঙ্গা করা যেতে পারে তার কৌশল শুভেন্দু অধিকারীর জানা আছে। সেই কারণে শুভেন্দু অধিকারীর বেশি করে খোঁজ খবর নিতেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায। মেদিনীপুরের রাজনীতিটা নির্ভর করে অনেকটা অধিকারী পরিবারের ওপরে। যদিও শুভেন্দু ছাড়া অধিকারী পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তৃণমূল কংগ্রেসে রযে গিয়েছেন। শুভেন্দু অধিকারীর বাবা শিশির অধিকারী তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ এখনও। শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করার ফলে বিজেপি রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি লাভ করেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বোলপুরকে কেন্দ্র করে ভোটের দামামা বাজিয়ে  দিয়ে  গেলেন নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন যে আসন্ন বিধানসভার নির্বাচনী ্প্রচারের ্প্রধান অঙ্গ হযে উঠবে সেটা আগে কেউই ভাবে নি। তবে রাজনৈতিক দলের নেতারা বোলপুরকে কেন্দ্র করে বিজেপির দিকে তাক করে রাজনৈতিক তর্জা শুরু কবে দেবে এটা তাদের কর্মসূচিতে ছিল। ফলে  বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস বোলপুরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তর্জা শুরু হয়ে গেল। নেত্রী এদিন বিজেপির দিকে তাক করে বলেছিলেন, টাকা দিয়ে কয়েকটা বিধায়কে কিনে ভাবছে তৃণমূল কংগ্রেসকে কিনে নিয়েছে । তৃণমূল কংগ্রেসকে কেনা যায় না। তৃণমূল কংগ্রেস এখন বটবৃক্ষ। খেলাটা এত সহজ নয় ।’ বাংলার সংস্ৃ্কতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দিকে পাল্টা বক্তব্য রাখতে শুরু করে দিলেন শমীক ভট্টাচার‌্য। তিনি বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম তো কংগ্রেস থেকেই। বাংলা এবং  বাঙালির সংস্ৃ্কতি তো সব থেকে বড় ক্ষতি করেছে কংগ্রেস। তারা নেতাজির সঙ্গে বিশ্বাসঘাকতা করেছে। 1886 সালে কংগ্রেসের সভাপতি হতে বিদ্যাসাগরকে আমন্ত্রণ করেছিলেন কংগ্রেস নেতারা। তাঁরা কী শুনে এসেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায তা পড়ে নিন।’

 গত 20 ডিসেম্বর বোলপুরে রোড শো করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেই রোড শোযে রাজ্যের পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। সেই সময়ে তিনি বলেছিলেন, বাংলায়  এবারে বিজেপি দুশোটি আসন পাবে। পাল্টা কর্মসূচি নিযে সোমবার বোলপুরে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাংলার বাউল শিল্পী বাসুদেব বাউল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে মধ্যাহ্ন ভোজন করিযে আপ্লুত করেছিলেন। তিনি আবার মুখ্যমন্ত্রীর কর্মসূচিতে এসে সঙ্গীত পরিবেশন করলেন। এখন বাসুদেব বাউলের অবস্থা দোটানার মধ্যে চলে গিয়েছে। বিজেপি নেতারা যদি তাঁর কাছে আসেন তাহলে তিনি ফেরাতে পারবেন না। আবার শাসক দলের নেতারা যদি আসেন তাহলে তিনি তাদেরকে সাদরে গ্রহণ করবেন। ফলে তাঁর অভাব থেকেই যাবে। এবারে বিজেপিকে বহিরাগত তত্ত্ব দিতে শুরু করে দিযেেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী। বিজেপি দলের নেতারা হচ্ছেন বহিরাগত। তাদেরকে বাংলা থেকে তাড়াতে হবে এই নিযে নির্বাচনী ্প্রচার করতে শুরু করে দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা। বহিরাগতরা এলে থানায খবর দিন।  গ্রামের মহিলারা  বলে দেবে যখন ঘরে পুরুষ থাকবে তখন যেন বিজেপি লোকেরা এসে কথা বলে। সেই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, নির্বাচন এলেই গ্রামে গ্রামে টাকা ছড়াচ্ছে। টাকা দিলে নিয়ে নিন। বিজেপিকে বিদায় দিন। এবারে যেভাবে  বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস সম্মুখ তর্জায়  নিজেদেৰ জড়িযে ফেলতে শুরু করে দিয়েছে তাতে নির্বাচনী ্প্রচার বলা যেতে পারে একেবারে গরম তেলে ভাজার মতো। নির্বাচন শেষ হলে সব গরম তেলে ভাজা একেবারে ঠাণ্ডা হযে মিইয়ে  যেতে থাকবে। তখন আর এই সব গরম গরম তর্জার কথাগুলো বা স্লোগানগুলো কারোর মনে থাকবে না। সবাই তখন মেনে হবে একটি খেলা হয়েছিল। নির্বাচন মানেই তো রাজনৈতিক ময়দানের খেলা। এই খেলায়  খেলতে এসে কারোর পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার কারোর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রাজনৈতিক দলের  নেতারা তো তাদের দলের কোচ হিসাবে কাজ করেন। তারা রাজনৈতিক খেলোয়াড়  বা ্প্রার্থী তৈরি করে নিবাচনে অংশ গ্রহণ করতে পাঠান। ফলে রাজনীতিটা হচ্ছে একটি ময়দান। সেখানে নির্বাচনটা হচ্ছে একটি ওয়ান ডে খেলার মতো। হার জিত  থাকবে। খেলাতে যেমন হার জিত থাকে এটাও ঠিক সেই রকম। গা গরম করা বত্তৃ্তা থাকবে। কর্মীদের উত্তেজিত করার  মতো বক্তব্য থাকবে। তারা সেই সব স্লোগান এবং বক্তব্য রেখে ভোটারদের আকর্ষন করতে চেষ্টা করবে। যে দল যত বেশি করে আকর্ষনীয় বক্তব্য বা স্লোগান দিতে পারবে ততই ভোটাররা তাদেরকে দিকে ঢলতে থাকবে। এখন বিশ্বভারতীকে সমানে রেখে বোলপুরে নির্বাচনী তর্জা হতে শুরু করে দিয়েছে। আগামি জানুযারি মাস থেকে আরও ব্যাপক হারে রাজনৈতিক খেলা দেখতে পাওযা যাবে। এবারে বোলপুরে শুভেন্দু অধিকারী এসে উপস্থিত হবেন। তিনি বিজেপির হয়ে রাজনৈতিক পারদের মাত্রা বৃদ্ধি করে দেবেন। কোনও সমযে দেখতে পাওযা যাবে যে বিশ্বভারতীর দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষ্যে ভারতের ্প্রধানমন্ত্রীর  আগমন ঘটে গিয়েছে । বোলপুরে রবীন্দ্রনাথের ছবিকে গলায ঝুলিযে রোড শো করলেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পাল্টা ্প্রধানমন্ত্রীকে একবার সফর করতে হবেই। সেই দিকে তাকিযে রয়েছে বাংলার তথা বোলপুরের বাসিন্দারা। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী লড়াইটা শুরু হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী বনাম ্প্রধানমন্ত্রী। বিজেপি বনাম তৃণমূল কংগ্রেসের। বিজেপি মুল লক্ষ্য হচ্ছে এখন বাংলার রাজনৈতিক অধিকার দখল করার। আবার তৃণমূল কংগ্রেস চেষ্টা করছে ক্ষমতায় টিকে থাকার। দেখা যাক কার রাজনৈতিক শক্তি বেশি এবং কতখানি।  

Loading...