বাড়ি কলকাতা বাংলা চলচ্চিত্রের ১০০ বছর এর কিছু টুকরো স্মৃতি ( প্রথম পর্ব )

বাংলা চলচ্চিত্রের ১০০ বছর এর কিছু টুকরো স্মৃতি ( প্রথম পর্ব )

1038
0
বাংলা চলচ্চিত্রে সূচনার কথা আলোচনা করতে গেলে ভারতীয চলচ্চিত্রের কথা এসে পড়ে| কারণ ভারতে চলচ্চিত্রে সূচনা করে গিযেিলেন একজন বাঙালি তার নাম হীরালাল সেন| তিনিই আবার বাংলা সিনেমার সূচনা করে যান| তিনিই প্রথম মুভি চলচ্চিত্রে কথা অনুভব করতে পেরেছিলেন| ফলে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের ঘটনাকে মুভি ক্যামেরার মাধ্যমে তুলেছিলেন| এমনকী নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন করতে গিযে যে ব্রিটিশ সরকার বিরোধী বক্তব্য রেখেছিলেন তার মুভি তুলেছিলেন হীরালাল সেন| পরে তাঁর এই ছবিটি দেখানো হযেিল কলকাতার টাউন হলে যখন বঙ্গভঙ্গ বিরোধীদের সম্মেলন হয|  হীরালাল সেন আবার প্রথম ব্যবসাযিক ছবি করে গিযেেন| বিজ্ঞাপনের ছবি তাঁর হাত দিযে ভারতে প্রথম আসে|  ১৯১৭ সালে তাঁর স্টুডিওতে আগুন লেগে যাওযায সব ছবি পুড়ে নষ্ট ছাই হযে যায| সেই কারণে তাঁর কাছে কোনও প্রমাণ ছিল না যে তিনি ভারতীয চলচ্চিত্রের জনক| কিন্তু প্রভাত মুখোপাধ্যায দাবি করেছেন যে হীরালাল সেন প্রথম ভারতীয যিনি সিনেমাকে ভারতে নিযে এসেছিলেন| কিন্তু হীরালালের ছবির কোনও উজ্জ্বল প্রমান না থাকার ফলে দাদা সাহেব ফলকে ভারতীয চলচ্চিত্রে জনক হিসাবে গ্রহণ করা হয| এবারে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে হীরালাল সেনকে ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে শতবর্ষ পালন করা হয| কলকাতার চলচ্চিত্র উত্সব কমিটি হীরালাল সেন পুরস্কার দেওযার কথা ঘোষণাও করে|
১৯০২ সালে জামশেদজি ফ্রামজি (১৮৫৬-১৯২৭) প্রজেকশন যন্ত্র কিনে কলকাতার মযদানে ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করেন| সেই সমযে তিনি দাদা সাহেব ফলকের ছবি ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র’ এবং প্রথম বাংলা ছবি ‘বিল্বমঙ্গল’   (১৯১৯) সালে দেখান| বাংলা ছবি ‘বিল্বমঙ্গল’ এর প্রযোজক ছিলেন মদন থিযোর এবং পরিচালক ছিলেন রুস্তমজি ধোতিওযালা| যদিও এটি ছিল নির্বাক চলচ্চিত্র| ‘বিল্বমঙ্গল’ ছবিটি পুরাণের কাহিনী নিযে তৈরি করা হযেিল| ইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি তৈরি করে একটি দল| তার নেতা ছিলেন ধীরেন গাঙ্গুলী (১৮৯৩-১৯৭৮)| সকলেই তাঁকে ‘ডিজে’ বলে ডাকতেন| তিনি বিশ্বভারতীর ছাত্র ছিলেন| কবিগুরুর প্রিয ছাত্র| নিজাম গর্ভমেন্ট আর্ট কলেজ (হাযদ্রাবাদ) এর  প্রধান হন| ১৯২১ সালে তিনি ‘বিলেত ফেরত’ নামে একটি বাংলা ছবি করেন| তাতে প্রধান মুখ্য অভিনেতা ছিলেন তিনি স্বযং| পরিচালক প্রমথেশ বড়ুযা এবং দেবকী বসু ছিলেন তত্কালীন যুগের খ্যাতনামা পরিচালক|
১৯১৯ থেকে ১৯৩৪ সাল পর‌্যন্ত ১২৬ টি ছবি নির্মাণ হযেিল| তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ‘তিভক্তি’ (১৯২২), ‘সোল অফ এ স্লেভ’ (১৯২৩), এবং ‘মোহিনী’ (১৯২২)| বাংলা থিযোরের কিংবদন্তি নাযক শিশির কুমার ভাদুড়ি ‘মোহিনী’ এবং ‘আধারে আলো’ ছবিতে নাযকের ভূমিকায অভিনয করেছিলেন| সেই সমযে অভিনেত্রী হিসাবে নাম করেছিলেন পেসেন্স কোপার, সিলভিযা বেল, তারাসুন্দরী, শ্রীমতি ওযার্থ এবং জুনে রিচার্ড| অভিনেতা হিসাবে খ্যাত হযেিলেন অহীন্দ্র চৌধুরী, গোপাল নাগ, প্রফুল্ল ঘোষ এবং সুরেন্দ্রনাথ ঘোষ| যদিও ‘ডিজে’ নাযক হিসাবে তত্কালীন যুগে সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হযেিলেন|  অরোরা ফিল্ম কোম্পানি কথা এখানে উল্লেখ করতেই  হবে| এই কোম্পানির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অনাদিনাথ বোস| তাদের প্রথম ছবি ‘পুজারি’ (১৯৩১)|  কালীপদ দাস ১৯৩১ সালে ‘জামাই বাৱু’ ছবি নির্মাণ করেন|  এটাই শেষ বাংলা নির্বাক ছবি| এরপরে সবাক ছবির যুগে প্রবেশ করে যায বাংলা সিনেমা| পরিচালক কালীপদ দাস বেশ তাঁর ছবিতে বাস্তব ধর্মী বেশ কিছু অভিনবত্ব দৃশ্যগ্রহণ করে দর্শকদের মধ্যে চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হযেিলেন| সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যাযে বেশ কিছু সৃষ্টিশীল সাহিত্য নির্বাক ছবি করে দেখানো সম্ভব হযেিল|
কযে সপ্তাহ পরে ‘আলম আরা’ ছবিটি সবাক চিত্র হিসাবে উপস্থিত হয| এর পরিচালক ছিলেন আরদেশির ইরানি| ১৯৩১ সালের ১১ এপ্রিল অমর চৌধুরীর পরিচালিত ‘জামাই ষষ্ঠী’ কলকাতার ক্রাউন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিলাভ করে| এটির প্রযোজক ছিল মদন থিযোরস| এই সমযে মিউজিক্যাল ছবি ‘শিরিন ফারহাদ’ ছবিটিও প্রকাশ লাভ করে| ১৯৩১ সালে বাংলা ছবির শিল্প গঠন হলেও মাত্র ৩ টে ছবি বাংলায তৈরি হয| বাকি ২০টি ছবি হিন্দিতে| বি এন সরকার (১৯০১-১৯৮০) প্রকৃত বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি শিল্প স্থাপন করেছিলেন| তিনি ‘চিত্রা’ নাম দিযে প্রথম উল্লেখযোগ্য সিনেমা প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন কলকাতায| ১৯৩০ সালে শেষ দিকে সিনেমা ক্রাফট এবং ১৯৩১ সালে ‘নিউ থিযোরস’ নির্মাণ করেন| সিনেমা শিল্পের অতি দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তি দেবকী বোস (১৮৯৮-১৯৭১) বাংলা ছবিতে নতুন টেকনিক নিযে এলেন| নিউ থিযোরস ‘ নটীর পুজা’ (১৯৩২) নির্মাণ করলো| এই ছবিটির পরিচালক ছিলেন নাট্যকার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর| ফোটোগ্রাফি করেন নীতিন বোস| ১৯৩২ সালে ‘চণ্ডিদাস’ ছবির পরিচালক ছিলেন দেবকী বোস| এই ছবিটি বেশ উল্লেখযোগ্য| ১৯৩৪ সালে প্রমথেশ বড়ুযা ‘রূপলেখা’ ছবি তৈরি করেন| পরে ১৯৩৫ সালে ‘দেবদাস’ ছবিটিতে অসাধারণ অভিনয করেছিলেন পরিচালক প্রমথেশ বড়ুযা| এই ছবিটি বাংলা  তথা ভারতীয সিনেমা জগতে প্রথম ট্রাজেডি ছবি হিসাবে পরিচিতি লাভ করে| অসমের গৌরীপুরের রাজবাড়ির ছেলে প্রমথেশ বড়ুযা ব্রিটিশ ডোমিনিযান ফিল্মসে কাজ করতে শুরু করেন ১৯২৯ সালে| তিনিই প্রথম প্রকৃত অর্থে বাংলা সিনেমা নির্মাণ করতে সক্ষম হযেিলেন| ১৯৩৭ সালে ‘দেবদাস’ এবং ‘মুক্তি’ ছবি নির্মাণ করেন| ‘মুক্তি’ ছবিটিই হচ্ছে একটি বাস্তবধর্মী বাংলা ছবি| অসাধারণ অভিনয এবং পরিচালনায বাংলার ছবির নতুন দিক নির্মাণ করতে সক্ষম হন প্রমথেশ বড়ুযা|
১৯১৬ সালে কানন দেবীকে আবিস্কার করল নিউ থিযোরস| তিনি বাংলা সিনেমার অন্যতম সফল অভিনেত্রী| প্রমথেশ বড়ুযার অভিনেত্রীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন যথাক্রমে যমুনা দেবী, লীলা দেশাই, মলিনা দেবী| ইনারা সকলেই যোগ্য অভিনেত্রী ছিলেন| জন্মসূত্রে পাঞ্জাবী কে এল সাযগল হিন্দি ‘দেবদাˆস’ ছবিতে অভিনয করেন|  কে সি দে ‘চণ্ডীদাস’ ছবিতে অভিনয করেন| গাযক পঙ্কজ মল্লিক ‘মুক্তি’ ছবিতে অভিনয করেছিলেন| পাহাড়ী সান্যাল গাযক এবং অভিনেতা হিসাবে বিদ্যাপতি (১৯৩৮) এবং বড়দিদি (১৯৩৯) ছবিতে অভিনয করে নাম করেন| সেই সমযে বিখ্যাত গীতিকার রাইচাঁদ বড়াল (১৯০৩-১৯৮১) বিভিন্ন ছবিতে সুর দিযে সুনাম অর্জন করেন| ‘চণ্ডীদাস’, চিরকুমারের সভা (১৯৩২), ভাগ্যচক্র (১৯৩৫) এবং বিদ্যাপতি (১৯৩৭) ছবিগুলোতে সুর দিযেিলেন| সুরকার কে সি দে এবং পঙ্কজ মল্লিক মিউজিক ডাইরেক্টর হযেিলেন| সেই সমযে কমল দাশগুপ্ত এবং শচীন দেববর্মন সিনেমা জগতে প্রবেশ করেন সুরকার এবং গাযক হন| কবিগুরু এবং কাজী নজরুল এর গান বহু ছবিতে ব্যবহার করা হযেে| ‘ভাগ্যচক্র’ ছবিতে নীতিন বোস প্রথম প্লেব্যাক সঙ্গীত ব্যবহার করেন| পরিচালক নীতিন বোস (১৮৯৭-১৯৮৬) সফল ডিরেক্টর ছিলেন|
তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হল – ‘দিদি’ (১৯৩৭), ‘দেশের মাটি’ (১৯৩৮) ‘জীবন মরণ’ (১৯৩৯)| ইতিমধ্যে মধু বোস ( ১৯০০-১৯৬৯) বাংলা ছবি পরিচালক হিসাবে প্রবেশ করেন| ১৯৩৭ সালে ‘আলিবাবা’ ছবি করেন| সেখানে সাধনা বোস মুখ্য ভূমিকায অভিনয করেছিলেন|  তাঁর অন্য ছবিগুলোর নাম হল ‘কুমকুম’ (১৯৪০) এবং রাজনর্তকী’ (১৯৪১)| সেই সমযে একদল পরিচালক বাংলা সিনেমার জগতে প্রবেশ করে| তার মধ্যে রযেেন বিমল রায, পশুপতি চট্টোপাধ্যায, জ্যোতিষ ব্যানার্জি, ্প্রেমাঙ্কুর আতীর্থ এবং সত্যেন বোস| এই সময থেকে বাংলার সিনেমার উন্নতি লাভ করতে শুরু করে| ১৯৩৪ সালে দেবকী বোস পরিচালিত ছবি ‘সীতা’ ভেনিস চলচ্চিত্র উত্সবে প্রদর্শিত হয| এটাই প্রথম ভারতীয ছবি যা বিদেশে চলচ্চিত্র উত্সবে দেখানো হয|
Loading...