বাড়ি আন্তর্জাতিক বাংলাদেশীয় বিলুপ্ত টক কুল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন

বাংলাদেশীয় বিলুপ্ত টক কুল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন

159
0

মহিউদ্দিন আহমেদ, বিশেষ প্রতিনিধি  বাংলাদেশ থেকে:

বাংলাদেশের গাজীপুর জেলা বিভিন্ন এলাকায় উঁচু চালা জমিতে, সড়কের ধারে অনেকটা অবহেলায় বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতো ‘টক কুল’ গাছ। নানা কারনে কৃষক আগাছা হিসেবে মনে করতো এ ধরনের কুল গাছকে।অবহেলার কারনে গত কয়েকবছরের ব্যবধানে টক কুল বিলুপ্তের তালিকায় চলে গিয়েছিল। তবে টক কুলয়ের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ায় এখন কৃষকের আগ্রহ তৈরী হয়েছে এই টক কুলকে কেন্দ্র করে। তারা বানিজ্যিক ভাবে শুরু করেছে টক কুল চাষ। এবার গাজীপুর জুড়েই হয়েছে টক কুলয়ের ভালো ফলন এতে কৃষকের মুখে হাঁসি ফুঁটে উঠেছে। লাভজনক বিধায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে এই কুল চাষ।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তথ্যমতে, জেলাজুড়ে এবার ৭৫০ হেক্টর জমিতে কুল চাষ হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুর সদরে ৩৭০ হেক্টর, শ্রীপুরে ২১৫ হেক্টর, কাপাসিয়ায় ৮৫ হেক্টর, কালিয়াকৈরে ৫৫ হেক্টর, কালিগঞ্জে ২৫ হেক্টর জমিতে কুলয়ের চাষ হয়েছে। কুলয়ের উৎপাদন হয়েছে ১১ হাজার ৩৯৭ মেট্রিকটন।প্রথমে কৃষক আপেল, বাউকুল সহ নানা ধরনের মিষ্টি কুল চাষে উৎসাহী হলেও গত ২-৩ বছর ধরেই তারা ফিরে গেছে দেশী টক কুল চাষে। এখন সবার আগ্রহের কেন্দ্রে এই টক কুল। ভালো দাম, কুলয়ের পুষ্টি গুনাগুন, সংরক্ষন ব্যবস্থা, রোগবালাই কম, ভালো ফলন ও বানিজ্যিক ব্যবহার বাড়ায়  প্রতিনিয়ত সম্প্রারিত হচ্ছে টক কুল চাষ।কাপাসিয়া উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের নলগাঁও গ্রামের শহীদ শিকদার এবার পাঁচ বিঘা জমির ২০০ গাছের টক কুল বিক্রি করেছেন ২ লাখ ৬১ হাজার টাকায়।তিনি জানান, আগে আপেল কুলের চাষ করতেন। কিন্তু স্থানীয় বাজারগুলোতে তেমন দাম পাওয়া যেত না। তাই আগাম কুল উৎপাদনের লক্ষ্যে পাঁচ বছর আগে তার বাগানের কুল গাছে বিলুপ্তপ্রায় দেশি প্রজাতির টক কুলয়ের কলম করেন। এটাতেই শুরু হয় তার সফলতা। এখন সবাই টক কুল চাষে ঝুঁকছেন।এই গ্রামের অন্য কৃষকদের ভাষ্য, আচার তৈরিতে টক কুল প্রয়োজন। টক কুলয়ে আগাম ফলন হয়, শুকিয়ে সংরক্ষন করা যায়, সবদিক মিলিয়ে গত কয়েকবছরে এর বানিজ্যিক ব্যবহার বাড়ায় এর চাহিদা তৈরী হয়েছে। এই কারনে সবাই টক কুল চাষে ঝুঁকছেন। তবে সবচেয়ে বড় সুবিদা হলো রোগবালাই না থাকায় কিটনাশক দিতে হচ্ছে না, তাই তেমন কোন খরচও নেই এই কুল চাষে। আগাম বাজারে উঠায় দামও পাওয়া যায় ভালো। বর্তমানে স্থানীয় বাজারগুলোতে টক কুল বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকা কেজি।শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর দক্ষিন পাড়া গ্রামের কৃষক আলী আহমেদ জানান, উঁচু চালাজমি হওয়ায় তার জমিতে তেমন কোন ফসল উৎপাদন হতো না, তাই তেমন এবার প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করে ৬শ দেশী বিলুপ্ত প্রজাতির টক কুলয়ের চারা রোপন করেছেন।নলগাঁও বাজারের কুল ব্যবসায়ী রাজু মিয়ার ভাষ্য, রাজধানীসহ সারাদেশেই এই টক কুলয়ের চাহিদা আছে। এ কুল শুকিয়ে সংরক্ষন করে বিদেশেও রপ্তানী করা হয়। অন্য প্রজাতির মিষ্টি কুল সংরক্ষন করা যায় না। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই বাজারে কুল নিয়ে আসে কৃষকরা। সেখান থেকে পাইকাররা ট্রাক ভর্তি করে রাজধানী সহ বিভিন্ন এলাকা নিয়ে যান বিক্রির উদ্দেশ্যে।শ্রীপুরের কুল চাষী জোবায়ের হোসেন প্রায় আট বিঘা পতিত জমিতে কুল চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন। তিনি বলেন, বাড়ির আশপাশের পতিত জমিতে কুল চাষ করে জমির ব্যবহারের পাশাপাশি ফল উৎপাদন করা যাচ্ছে। টক কুল চাষে তার মতো এলাকার অনেকেই আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মাহবুব আলম জানান, জেলা জুড়ে বসত বাড়ির আশপাশে ফেলে রাখা পতিত জমিতে ব্যাপকভাবে কুল চাষ হচ্ছে। কুল গাছে কৃষকরা কলম করে তারা সহজেই জাত পরিবর্তন করতে পারে। বর্তমানে প্রতি হেক্টর জমিতে ১০-১৫ টন কুল উৎপাদন হচ্ছে। বানিজ্যিক ব্যবহার বাড়ায় ভালো দামে কৃষক লাভবান হচ্ছেন, এতে গ্রামীন অর্থনীতিও সাবলম্ভী হয়ে উঠছে।টক কুল চাষে কৃষক কেন আগ্রহ হলো এর কারন জানাতে গিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইন্সস্টিটিউট এর ফল গবেষণা বিভাগের উর্দ্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো.জিল্লুর রহমান জানান, একদিকে টক কুল শুকিয়ে সংরক্ষন করে নানা ধরনের মুখরোচক খাবার সহ আচার তৈরী করা যায় আবার পুষ্টি গুনাগুন বেশী থাকায় দেশ জুড়েই এর ব্যাপক চাহিদা তৈরী হওয়ায় কৃষক টক কুল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সবমিলিয়ে বানিজ্যিক ব্যবহার বেড়েছে এই টক কুলয়ের।

Loading...