বাড়ি সম্পাদকীয় দেশের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের সম্পর্ক ছিল জীবন্ত

দেশের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের সম্পর্ক ছিল জীবন্ত

77
0

কলকাতা, ১১ জনুয়ারি : একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের ভারতে আজও প্রাসঙ্গিক স্বামী বিবেকানন্দের চেতনা ও দর্শন। তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি সমাজের বৃহত্তর অংশের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বামীজির সেবাধর্ম মানবতার পথে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। তৃতীয় বিশ্বের এই দেশে স্বামীজীর শিব জ্ঞানে জীব সেবার বাণী আমাদের ধমনীতে মানবতার স্রোতকে আরো বেশি চঞ্চল করে তোলে। পরমব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু সর্বত্রই তিনি প্রেমের স্পন্দন অনুভব করেছিলেন। বর্তমান ভারতে স্বামীজীর আদর্শের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অচিন্ত্য বিশ্বাস জানিয়েছেন, স্বামী বিবেকানন্দের সময়ে সংস্কৃতির একমাত্রিক ধারা বিচরণ করত বিশ্বজুড়ে। অর্থাৎ ইউরোপীয়রা মনে করত যে তাদের সংস্কৃতিই শ্রেষ্ঠ। কিন্তু শিকাগো ধর্ম সভায় এবং পরবর্তী সময়ে অক্সফোর্ডের ট্রিনিটি কলেজের নিজের বক্তৃতায় তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে পাশ্চাত্যের তুলনায় প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতা, দর্শন আরও উন্নততর। স্বামী বিবেকানন্দ থেকে ঋষি অরবিন্দ বিশ্বমাঝে ভারতের সেই আধ্যাত্মিক চিন্তন এবং দর্শনকে তুলে ধরেছিলেন। ফলে আজও যখন কোন সুশিক্ষিত ভারতীয় বিদেশে পাড়ি জমান তখন বিশ্ববাসী তাদের এই কারণে সম্মান করেন যে তারা ভারত থেকে এসেছে। সেই ভারত যে প্রাচীনতম জ্ঞানকে চর্চা করে চলেছে। স্বামী বিবেকানন্দ এবং ঋষি অরবিন্দ দুজনেই ভারতের ভাবমূর্তিকে বিশ্বমাঝে উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন। স্বামীজীরর বিপুল কর্মকাণ্ডকে অচিন্ত্যবাবু তিনটি বিন্দুতে বিভক্ত করেছেন। প্রথম পর্যায় রামকৃষ্ণ পরমহংসের পরম্পরা স্বামীজি অনুধাবন করে তা নিজের কাজের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। পরিবার এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি থেকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যে জ্ঞান আরোহণ করেছিলেন, তা ছিল ভারতের পারম্পরিক জ্ঞান। সেই জ্ঞানকে আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বিদ্বানের উপলব্ধি এবং অভিজ্ঞতাই সহ-নাগরিকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। শুধু তথ্যভিত্তিক জানা নয়। জ্ঞানের আত্মোপলব্ধি হচ্ছে মূল। যদিও বর্তমান ভারত সেই পথে এখনও নিজেকে পুরোপুরি তৈরি করে তুলতে পারেনি। উন্নততরর সমাজ ব্যবস্থা ভারতে গড়ার ক্ষেত্রে সবথেকে বড় অন্তরায় যে জাতপাত সেটা স্বামী বিবেকানন্দ অনুভব করেছিলেন। তাই তিনি জাতপাতের বিরুদ্ধে ছিলেন। এই প্রসঙ্গে আলোকপাত করতে গিয়ে অচিন্ত্য বিশ্বাস জানিয়েছেন, যে ব্রহ্ম মহাবিশ্বের কেন্দ্রে আছে তা প্রতিটা মানুষের মধ্যে আছে। তার পার্থিব দুঃখ, কষ্ট দূর করা সেবার মাধ্যমে একান্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে স্বামী বিবেকানন্দ সমাজের প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষের মুক্তির কথা বলেছিলেন। মানুষের মধ্যেও যে ব্রহ্ম-এর উপস্থিতি তার ওপর আলোকপাত তিনি ১৮৯৩ সালে অক্সফোর্ডের ট্রিনিটি কলেজের এক সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন হাথরাসের মতন ঘটনা ঘটে বা নিচু জাতির বিয়েতে ঘোড়ায় চড়া মানা করে দেয় উচ্চবর্ণেরা সেই সময়ই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে স্বামী বিবেকানন্দের শ্রেণীহীন সমাজের আদর্শ।দেশমাতৃকাকে স্বামীজি যে নজরে দেখতেন সে বিষয়ে বলতে গিয়ে অচিন্ত্য বিশ্বাস জানিয়েছেন, দেশ বলতে স্বামীজির কাছে নিছক মানচিত্র নয়। দেশ ছিল তার কাছে জলজ্যান্ত মানুষ। দেশের সঙ্গে স্বামীজীর সম্পর্ক জীবন্ত।

Loading...