বাড়ি স্বাস্থ্য ক্যান্সার নিয়ে ‘হু’-র হুঁশিয়ারি, অভিজ্ঞদের মতে সচেতনতাটাই মুখ্য

ক্যান্সার নিয়ে ‘হু’-র হুঁশিয়ারি, অভিজ্ঞদের মতে সচেতনতাটাই মুখ্য

123
0


কলকাতা, ২৪ ফেব্রুয়ারি: আগামী দশকে প্রতি ১০ জন ভারতীয়ের একজন ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হবেন| প্রতি ১৫ জন আক্রান্তের একজন এই রোগে মারা যাবেন| এ কারণে সর্বস্তরে  সচেতনতার কথা জানিয়েছেন অভিজ্ঞরা|

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে এই ভয়ঙ্কর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে| এই রিপোর্টে আর্থসামাজিক অসাম্যের নানা স্তরে কী ধরণের রোগ হচ্ছে, তা বলা হয়েছে| রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিচু আর্থসামাজিক মানের লোকেরা মুখের এবং সার্ভাইক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে| ওরাল ক্যান্সার আক্রান্তদের ৯০% জীবনযাত্রার মান অপেক্ষাকৃত নিচু| শহুরে শিক্ষিত সমাজের বাসিন্দাদের বুকে ক্যান্সারে আক্রান্তের আশঙ্কা থাকে|

ক্যান্সারের ভয়াবহতার কথা তো অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে| কিন্তু পরিত্রাণের পথ কী? মানুষকে যে রোগগুলো বেশি ভোগায়, তার মধ্যে ক্যান্সার সবচেয়ে ভীতিকর। এ কথা স্বীকার করেছেন বিশেষজ্ঞ উৎপল সান্যাল। ৩২ বছর তিনি চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালের গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। বিশিষ্ট এই বিজ্ঞানী এই প্রতিবেদককে বলেন, “এত বড় একজন রক্ত বিশেষজ্ঞ আশীষ মুখার্জী অকালে চলে গেলেন।  তিনি নিজেও পারলেন না ক্যান্সারের থেকে নিজেকে রক্ষা করতে। ক্যান্সার থেকে মানুষের বাঁচার এবং বাঁচানোর একটা প্রধান পথ সর্তকতা এবং সাবধানতা। এ ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেককে ভীষণরকম সচেতন হতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবসর নেওয়ার পর এখনও আমি প্রতি বছর বেশ কিছু সচেতনতামূলক শিবিরে অংশ নিই।“

 কিন্তু কীভাবে মানুষ সতর্ক হবে? বিশেষজ্ঞরা জানান, ক্যান্সার শরীরে একবার বাসা বেঁধে ফেললে রোগীকে বাঁচিয়ে ফেরানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যায়। ক্যান্সার হয়ে গেলে আরও অনেক রোগ চেপে বসে শরীরে। তখন রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা একেবারে দুঃসাধ্যই হয়ে যায়। তবে কেউ যদি প্রাথমিক পর্যায়েই এই মরণব্যাধি শনাক্ত করে ফেলতে পারে, তার বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানিই উজ্জ্বল থাকে।

 ১ দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি— আপনি যদি দীর্ঘ সময় ধরে ক্লান্তিবোধ করেন অথবা অবসাদে ভোগেন তবে সেটা অনেক রোগেরই কারণ হতে পারে, হতে পারে ক্যান্সারও। মলাশয়ের ক্যান্সার বা রক্তে ক্যান্সার হলে সাধারণত এমন উপসর্গ দেখা যায়। তাই, আপনি যদি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি ক্লান্তিবোধ করেন অথবা দীর্ঘসময় ধরে ক্লান্ত থাকেন, অবিলম্বে চিকিৎসাসেবা নিন।

২. আকস্মিক ওজন হ্রাস- কোনও কারণ ছাড়া হঠাৎ করেই দ্রুতগতিতে যদি ওজন হারাতে থাকেন, তবে ভাবনার কারণ আছে। অনেক ক্যান্সারই সাধারণত হুট করে ওজন কমিয়ে ফেলে। তাই শরীরের ওজনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে সবসময়।

৩. দীর্ঘদিনের ব্যথা- দৃশ্যত কোনো কারণ (যেমন জখম-আঘাত) ছাড়া যদি আপনি দীর্ঘদিন ধরে শরীরের কোনো স্থানে ব্যথায় ভোগেন, তবে তাতে ওষুধও কাজ না করলে এ নিয়ে ভাবনার কারণ আছে। শরীরের কোন জায়গায় ব্যথা করছে তার ওপর নির্ভর করছে রোগী ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত নাকি ডিম্বাশয়, পায়ুপথ বা মলাশয়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত।

৪. অস্বাভাবিক মাংসপিণ্ড-আপনি যদি শরীরের কোনও অংশে অস্বাভাবিক কোনও মাংসপিণ্ড দেখতে পান অথবা মাংস জমাট হতে দেখেন কিংবা এ ধরনের পরিবর্তন বুঝতে পারেন, তবে এটা তেমন কিছুরই লক্ষণ, যা আপনার কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত। এমনকি আপনার শরীরে কোনও পরিবর্তন স্বাভাবিক মনে হলেও পর্যবেক্ষণ করুন, এরপর অন্তত চিকিৎসককে জানান।

৫. ঘন ঘন জ্বর- ক্যান্সার শরীরে জেঁকে বসলে স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। এতে ঘন ঘন জ্বর দেখা দেয়। দুর্ভাবনার ব্যাপার হল, কিছু ক্যান্সারের শেষ পর্যায়েরই উপসর্গ ঘন ঘন জ্বর। তবে ব্ল্যাড ক্যান্সারসহ এ ধরনের কিছু ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়েই ঘন ঘন জ্বর দেখা দেয় শরীরে।

৬. ত্বকে পরিবর্তন- অনেকেই ত্বকের ক্যান্সারের ব্যাপারে সচেতন নন। ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তনই এমন ক্যান্সার শনাক্ত করার সহজ উপায়। তাই ত্বকে অতিরিক্ত তিল বা ফ্রিকেল অথবা আঁচিলের দিকে খেয়াল করুন। যদি এর রং, আকারে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। ত্বক লালচে হয়ে যাওয়া, ফস্কুড়ি পড়ে যাওয়া এবং রক্তক্ষরণও অন্যান্য ক্যান্সারের উপসর্গ।

৭. দীর্ঘস্থায়ী কাশি- আপনি যদি দেখেন যে ওষুধ সেবনের পরও কাশি সারছেই না, তবে শীতকালীন কাশির চেয়েও এটা বেশি কিছু ধরে নিতে হবে। আর এই কাশির কারণে যদি আপনার বুক, পিঠ বা কাঁধে ব্যথা করে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। 

৮. মল-মূত্রত্যাগের অভ্যাসে পরিবর্তন- যদি মল বা মূত্রত্যাগের জন্য ঘন ঘন শৌচাগারে যেতে হয়, তবে এখানে ক্যান্সার নিয়ে ভাবনার কারণ আছে। ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যও মলাশয়ের ক্যান্সারের লক্ষণ। মূত্রত্যাগের সময় অন্ত্রে ব্যথা বা রক্তক্ষরণ মূত্রথলির ক্যান্সারের উপসর্গ।

৯. অকারণে রক্তক্ষরণ- যদি কাশির সময় রক্তক্ষরণ হয়, তবে এটা ক্যান্সারের বড় লক্ষণ। এছাড়া স্ত্রী অঙ্গ (ভ্যাজিনা) বা মলদ্বার থেকে রক্তক্ষরণসহ এ ধরনের অন্যান্য অস্বাভাবিকতাও ক্যান্সারের উপসর্গ।

১০. খাবার গ্রহণে সমস্যা- কেউ খাবার খেলেই যদি নিয়মিত বদহজমে ভোগেন, তবে পেট, কণ্ঠনালী বা গলার ক্যান্সার নিয়ে ভাবনার কারণ আছে। অবশ্য সাধারণত এসব উপসর্গকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। তবু অসুস্থতাকে কখনও এড়িয়ে যেতে নেই।

 অ্যাপেলো হাসপাতালেরর চিকিৎসক অনিমেষ সাহা জানান, “২০১৮ সালে বিশ্বে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন| এশিয়ায় এর পরিমাণ ৪৮ শতাংশ| ২০১৮-তে মারা গিয়েছেন প্রায় ৯৫ লক্ষ মানুষ| ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রতি ৮ জন পুরুষের একজন এবং প্রতি ১১ জন মহিলার একজন মারা গিয়েছেন| এশিয়ায় এ রকম মৃতের সংখ্যা আরও বেশি|” তিনি সতর্ক করে দেন স্থূলতা, নির্বিচারে খাওয়া-দাওয়া, শরীরচর্চায় অনীহা-এ সবের জন্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে| কিন্তু নিরাময়ের সুযোগ অনেক বেশি থাকে যদি গোড়ায় ধরা পড়ে| এখন ত্রিমাত্রিক ম্যামোগ্রাম, ডিজিটাল টেকনোলজি প্রভৃতির মাধ্যমে চিকিৎসা অনেক আয়ত্তের মধ্যে এসেছে| অস্ত্রোপচারে এসেছে আধুনিক নানা সুযোগ|

 ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে বর্তমানে সুস্থ জীবন কাটাচ্ছেন  কলকাতার অবস্থাপন্ন ঘরের বধূ সোনিয়া মহাজন| তিনি বলেন, “যখন শুনলাম আমার সেকেন্ড স্টেজ ক্যান্সার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল| কিন্তু নিজেই বুঝলাম কেঁদে লাভ নেই| সবাইকে বাঁচাতে গেলে নিজেকে বাঁচাতে হবে আগে| গোড়াতেই ম্যামোগ্রাফি না করায় রোগ ধরা পড়ে দেরিতে| সবরকম চেষ্টা শুরু করলাম| মাথার চুল সব পড়ে গিয়েছিল| কিন্তু লড়াইয়ের ওই মানসিক শক্তিটা তখন যদি না আনতে পারতাম, তাহলে কী হত, বলা মুশকিল| আমাদের প্রত্যয় আনতে হবে কোন কিছুই অসম্ভব নয়| পারতে হবে, বাঁচতে হবে|” 

‘হু’-র রিপোর্ট বলছে, ভারতে নতুনভাবে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ কোটি ৬০ লক্ষ| ২০১৮-তে ৭ লক্ষ ৮৪ হাজার জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে| প্রকোপ বেশি ব্রেস্ট ক্যান্সার, ওরাল ক্যান্সার, সার্ভিক্যাল ক্যান্সার, লাং ক্যান্সার, স্টমাক ক্যান্সার, কলোরেক্টাল ক্যান্সার প্রভৃতি| আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেক এ ধরনের ক্যান্সার রোগের শিকার| এরকম চলতে থাকলে আগামী দশকে এখনকার তুলনায় ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ৬০% বেড়ে যাবে| এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে মধ্য ও নিম্ন আয়ের লোকদের মধ্যে|

এই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে বুকের ক্যান্সারে| তার পর মুখের ক্যান্সার- যথাক্রমে ১ লক্ষ ৬২ হাজার ৫০০ এবং ১ লক্ষ ২০ হাজার| এর পর আক্রান্তের সংখ্যা বেশি ঘাড়, ফুসফুস, পাকস্থলী ও মলদ্বারে| সংখ্যা যথাক্রমে ৯৭ হাজার, ৬৮ হাজার, ৫৭ হাজার ও ৫৭ হাজার| এগুলো  প্রায়শই বিনা উপসর্গে হয়ে থাকে| অর্থাৎ কোনও লক্ষণীয় উপসর্গ তৈরি করে না| অথবা এটি প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল অস্পষ্ট উপসর্গ|

Loading...