বাড়ি কলকাতা কলকাতার ব্যাঙ্কিং জগতে বড় ঘা, সরে গেল দুটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের সদর কার্যালয়

কলকাতার ব্যাঙ্কিং জগতে বড় ঘা, সরে গেল দুটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের সদর কার্যালয়

1429
0

 কলকাতা, ১ এপ্রিল : এপ্রিল ফুল নয়, আক্ষরিক অর্থেই বুঝি বোকা বনল পূর্ব ভারত বা পশ্চিমবঙ্গ। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে কলকাতার ব্যাঙ্কিং জগৎ। প্রায় দেড়শ বছরের কৌলিন্য ছিল কলকাতার ব্যাঙ্কিং মানচিত্রের। ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (ইউবিআই), এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাঙ্ক (ইউকো)— গতকাল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ব এই তিনটি ব্যাংকের সদর দফতর ছিল কলকাতায়। আজ থেকে ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক এবং ৭০ বছরের প্রাচীন ইউবিআই মিশে গেল পাঞ্জাব ন্যশনাল ব্যাঙ্কের সঙ্গে। আর ১৫৫ বছর আগে তৈরি এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক মিশে গেল ১১৩ বছরের ইউনিয়ন ব্যাঙ্কের সঙ্গে। কলকাতা থেকে এর সদর দফতর স্থানান্তরিত হল চেন্নাইয়ে। রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাঙ্কের তকমা প্রত্যাহৃত হল ইউকো থেকে। ভারতের প্রাচীনতম জয়েন্ট স্টক ব্যাঙ্ক ছিল এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক। ২০১৪-র ২৪ এপ্রিল এর ১৫০ বছর পালিত হয়। ১৮৬৫ সালে ইউরোপীয়রা এলাহাবাদে প্রথম তৈরি করে এই ব্যাঙ্ক। উনিশ শতক শেষ হবার আগেই ঝাঁসি, লখনউ, কানপুর, বেরিলি, নৈনিতাল, কলকাতা, এবং দিল্লিতে শাখা করে এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক। বিশ শতকের গোড়ার দিকে স্বদেশী আন্দোলনের শুরুতে এই ব্যাঙ্কের সুসময় দেখা যায়। ১৯২০ সালে পি অ্যান্ড ও ব্যাংকিং কর্পোরেশন এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক অধিগ্রহণ করে। শেয়ারের দর ছিল সে সময় ৪৩৬ টাকা। ১৯২৩-এ কলকাতায় এই ব্যাঙ্কের সদর দফতর এবং রেজিস্টার্ড অফিস স্থানান্তরিত হয়। কলকাতা তখন গোটা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের অন্যতম মূল ক্ষেত্র। ১৯২৭ চার্টার্ড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, অস্ট্রেলিয়া এন্ড চায়না (পরবর্তীকালে যা শুধুই চার্টার্ড ব্যাঙ্ক হিসেবে পরিচিত) পি অ্যান্ড ও অধিগ্রহণ করে। কিন্তু এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের পৃথক অস্তিত্ব থেকে যায়। ১৯৬৯-এর উনিশে জুলাই আরও ১৩ টি ব্যাঙ্কের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ব হয় এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক। ১৯৮৯-এর এর অক্টোবরে ইউনাইটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাঙ্ক সঙ্কটে পড়লে কেন্দ্র এটিকে এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। ২০১৮ সালে এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের শাখা ছিল ৩,৫০৩। কর্মী ২৩ হাজার ২১০।  শেষ হল বঙ্গজীবনের অঙ্গ ইউবিআইয়ের সাত দশকের যাত্রা। ১৯৫০ সালে কুমিল্লা ব্যাংকিং কর্পোরেশন (নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত কর্তৃক ১৯১৪ সালে স্থাপিত), বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক (জে. সি. দাশ কর্তৃক ১৯১৮ সালে স্থাপিত), কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক(ইউ. বি. দত্ত কর্তৃক ১৯২২ সালে স্থাপিত) এবং হুগলি ব্যাঙ্ক (ডি. এন. মুখোপাধ্যায় কর্তৃক ১৯৩২ সালে স্থাপিত)— এই চার ব্যাঙ্কের মিলিত হয়ে ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া গঠন করে। চারটি ব্যাঙ্কেরই প্রতিষ্ঠাতা চার বাঙালি। সবার আগে তৈরি হয় কুমিল্লা ব্যাঙ্কিং কর্পোরেশন। এন সি দত্ত ছিলেন আইনজীবী। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ছিলেন জ্যোতিষচন্দ্র দাস। ব্যাঙ্কিং ব্যবসায় অভিজ্ঞ ছিলেন কুমিল্লার ইন্দুভূষণ দত্ত। ১৯২২ সালে স্থাপন করেন কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক। আর উত্তরপাড়ার জমিদার, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং ধনেখালির তৎকালীন বিধায়ক ধীরেন্দ্রনারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের হাতে তৈরি হয় হুগলি ব্যাঙ্ক লিমিটেড, যার সদর দফতর ছিল ধর্মতলায়। ১৯৬১ সালে কটক ব্যাঙ্ক ও তেজপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাঙ্ক ইউনাইটেড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার সঙ্গে মিলিত হয়ে যায়। ১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই অন্য ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের সঙ্গে এই ব্যাঙ্ককেও ভারত সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করে। এই সময় ইউবিআই-এর মাত্র ১৭৪টি শাখা ছিল। ১৯৭১ সালে ইউবিআই হিন্দুস্তান মার্চেন্টাইল ব্যাঙ্ক এবং ১৯৭৬ সালে নারাঙ্গ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া অধিগ্রহণ করে। ২০০৯ সালের ৩০ মার্চ ভারত সরকার ইউবিআই-এর সংস্কার অনুমোদন করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের যে সব অঞ্চলে ব্যাঙ্ক নেই, সেখানে শাখা খোলাই ছিল এর পরিষেবা সম্প্রসারণ কর্মসূচির অঙ্গ। এক সময়ে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা প্রায় ছিলই না। সুন্দরবনের মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নদী। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য এক সময়ে নদীপথই ছিল সম্বল। আজ থেকে প্রায় ৪৪ বছর আগে নদীপথকে ব্যবহার করেই সেখানে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা চালু করেছিল ইউবিআই। দুটি ভ্রাম্যমাণ লঞ্চে ব্যাঙ্কের শাখা চালু করে তারা। সেগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মানুষকে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা দিত। টাকা জমা দেওয়া, তোলা-সহ বিভিন্ন ব্যাঙ্কিং পরিষেবা দেওয়ার জন্য এই লঞ্চদুটিই ব্যাঙ্কের শাখা হিসাবে কাজ করত। ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের উদ্যোগেই ইউবিআই-এর রজত জয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি ভবনে ব্যাঙ্কের একটি শাখার উদ্বোধন হয়, যার পোশাকি নাম প্রেসিডেন্ট এস্টেট ব্রাঞ্চ। রাষ্ট্রপতি ভবনে এটাই কোনও ব্যাঙ্কের প্রথম শাখা। পরে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের আমলে রাষ্ট্রপতি ভবনেই আরও বড় জায়গায় শাখাটি স্থানান্তরিত করা হয়। বাংলার ছোট-বড় শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ইউবিআই-এর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। রাজ্যের চা শিল্পে এই ব্যাঙ্কই সব থেকে বেশি ঋণ দিয়েছে। এক সময়ে ব্যাঙ্কের মোট ঋণের ৩০ শতাংশই পেত চা শিল্প। ঋণের আওতায় রয়েছে পাট শিল্পও। রাজ্যের বহু ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে ইউবিআই-এর ভূমিকা কম নয়। ফুলের চাষ, কুমোরটুলির প্রতিমা শিল্প, তাঁত শিল্প, চিরুনি বা পিতলের জিনিস তৈরির মতো উদ্যোগকে চাঙ্গা করতেও এগিয়ে এসেছে ইউবিআই। এ রাজ্যের হিমঘরগুলিকেও বিমুখ করেনি। ঋণ নিয়ে ব্যবসা বাড়িয়েছে বড় মাপের অনেক শিল্প সংস্থাও। প্রথম যে বড় শিল্পগোষ্ঠীকে এই ব্যাঙ্ক ঋণ দেয়, সেটি হল টাটা গোষ্ঠী। তাদের একটি কাপড়ের মিল ইউবিআই-এর থেকে ঋণ নেয়। বিড়লা গোষ্ঠীর প্রথম যে দুটি সংস্থা ইউবিআইয়ের দেওয়া ঋণের তালিকায় আসে, তারা হল হিন্দ সাইকেল এবং ইন্ডিয়ান রেয়ন। কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেল বা ওবেরয় গোষ্ঠী, বেঙ্গল কেমিক্যালস, বেঙ্গল এনামেল, সরস্বতী প্রেস, মার্টিন বার্ন, টিস্কো ইত্যাদি সংস্থার ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ইউবিআই-এর ঋণের বড় ভূমিকা রয়েছে। পঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অব কমার্স এবং ইউবিআই— তিনটি ব্যাঙ্ক মিলে তৈরি হল নতুন একটি ব্যাঙ্ক। ধানের শীষের প্রতীক যুগ যুগ ধরে বাংলার প্রায় সব ঘরেই ছিল অতি পরিচিত। কিছুকাল আগে ৭০ বছরের জন্মদিনে মায়াবী আলোর মালায় সেজেছিল কলকাতায় ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার সদর দফতর। ১ এপ্রিল থেকে ইউবিআই আর থাকছে না। । মিশে গেল পিএনবি-র সঙ্গে। নতুন নাম, নতুন লোগোর আড়ালে হারিয়ে যাবে বাঙালির আদি ব্যাঙ্কিং ব্যবসার একটা উজ্জ্বল অধ্যায়। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ঘনশ্যম দাস বিড়লা ভারতীয় মূলধন ও ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক তৈরির পরিকল্পনা করেন। তৈরি হয় ইউকো ব্যাঙ্ক লিমিটেড। বিড়লা স্বয়ং ছিলেন চেয়ারম্যান। পরিচালনামন্ডলীতে ছিলেন বিভিন্ন শিল্পের বিশিষ্টরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন জায়গায় শাখা খোলে ইউকো। তৎকালীন রেঙ্গুনে ১৯৪৭এ, সিঙ্গাপুরে (‘৫১), হংকং(’৫২), লন্ডন (’৫৩), এরপর মালয়েশিয়ায় খোলা হয় তাদের শাখা।১৯৬৩-তে মালয়েশিয়া সরকার ইউকো অধিগ্রহণ করে তৈরি হকরে পিপলস ব্যাঙ্ক। এখন ভারতে ইউকো কেবলই আঞ্চলিক ব্যাঙ্ক। ১ এপ্রিল থেকে এটি মিশে গেল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্কের সঙ্গে। কলকাতায় ডালহৌসিতে এক বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ইউবিআই, এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক এবং ইউকো-র সদর দফতর। ব্রিটিশ আমলে এই তল্লাটে ছিল গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ওই সব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই আজ অবলুপ্ত। দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাঙ্কের সদর দফতরের মর্যাদাও আজ হারিয়ে গেল এখান থেকে। কী বলব একে? কালের অমোঘ পরিণতি? না নিঃশব্দ পতন?

Loading...