বাড়ি দেশ ইতালি, স্পেন ও আমেরিকার মতো ভুল না করাই শ্রেয়, ২১ দিন পরিবারের...

ইতালি, স্পেন ও আমেরিকার মতো ভুল না করাই শ্রেয়, ২১ দিন পরিবারের সঙ্গেই থাকুন : রবীন্দ্র কিশোর সিনহা

71
0


নয়াদিল্লি, ২৬ মার্চ : মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতির উদ্দেশে ভাষণে ২১ দিনের জন্য সমগ্র দেশে লকডাউন (তালাবন্দী) ঘোষণা করে কঠোর সিদ্ধান্ত তো নিয়েই ফেলেছেন। এমন আগে কখনও হয়নি, হয়তো হবেও না। কিন্তু, এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং দেশের জন্য অপরিহার্য ছিল। হাত জোড় করে ২১ দিনের জন্য ১৩০ কোটি দেশবাসীকে ঘরে থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, তিনিই দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি সঙ্কটের এই মুহূর্তে ১৩০ কোটি দেশবাসীর আবেগ ও অনুভূতি বুঝতে পেরে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মোদীজি বলেছেন, এই ২১ দিন যদি আমরা অবহেলা করি, তাহলে দেশ ২১ বছরের জন্য পিছিয়েও যেতে পারে। দেশের ১৩০ কোটি জনগণের আবেগ ও অনুভূতি বুঝে এবং জনগণের সম্মতিতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, অন্যান্য দেশের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার পর আমাদের দেশের জন্য সর্বোত্তম ও সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রীর এই কথা ভারিক্কি রয়েছে। এই মহামারি যখন ইতালি, স্পেন এবং আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন চিনের মতো এই সমস্ত দেশেও লকডাউন করার বিকল্প ছিল। কিন্তু, ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে তারা চিকিৎসা সুবিধায় সক্ষম এবং লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে দেশের জনগণের মনে ভীতির পরিবেশ তৈরি হবে। ইতালিতে লকডাউনের সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ফলে গোটা ইতালি মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। মৃতদেহগুলি ট্রাকে করে বহুদূরে নিয়ে গিয়ে কবর দিতে হচ্ছে, যা প্রতিদিনই টেলিভিশন চ্যানেলে দেখা যাচ্ছে।একই পরিস্থিতি স্পেনেও। স্পেনের মতো সুন্দর দেশ করোনার প্রকোপে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমেরিকা থেকে প্রতিদিনই নিকটাত্মীয় অথবা বন্ধুবান্ধবের ফোন আসছে, তাঁরা বলছেন আমেরিকার থেকেও আপনারা অনেক ভালো আছেন। কারণ, অত্যাধুনিক সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমেরিকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সংক্রমণের চেনকেই ছিঁড়ে ফেলতে হবে। কারণ, যদি কেউ কোনওভাবে সংক্রমিত হয়ে যান, আর সে যদি সমাজে ঘুরতে থাকে তাহলে অসংখ্য মানুষকে সংক্রমিত করে ফেলতে পারেন। ইউরোপ ও আমেরিকার তুলনায় ভারতের জনসংখ্যা অনেক বেশি। ফলে একে-অপরের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়বে।প্রধানমন্ত্রী তথ্যের মাধ্যমে খুব ভাল করে বুঝিয়েছেন যে, সমগ্ৰ বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা এক লক্ষতে পৌঁছতে ৬৭ দিন সময় লেগেছে। অথচ, ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষতে পৌঁছতে মাত্র ১১ দিন সময় লেগেছে, এবং ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ পৌঁছতে মাত্র ৪ দিন সময় লেগেছে। যদি এইভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তাহলে যেনতেন প্রকারেন সংক্রমণ ছড়ানো বন্ধ করাই উচিত।সুতরাং, ২১ দিনের ঐতিহাসিক লকডাউন স্বাগত যোগ্য। বিশ্বে কখনই এমন হয়নি, ভবিষ্যতেও যেন এমনটা না হয়। শুরুতে তো আমাদের দেশে সব কিছুই ঠিকঠাক ছিল। চিনের উহান শহরে যখন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল, তৎক্ষণাৎ আমাদের ভারতীয় নাগরিক এবং প্রতিবেশী দেশ ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের নাগরিকদের সফলভাবে চিন থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তাঁদের গুরুগ্রামের কাছে আইটিবিপি-র আইসোলেসন ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল, ১৪ দিন পার্যবেক্ষনের পর তাঁর নিজেদের বাড়িতে ফিরে যান। কিন্তু, আন্তর্জাতিক বিমানে আসা প্রত্যেককে কঠোরভাবে আইসোলেশনে রাখা যায়নি। সমস্ত আন্তর্জাতিক বিমানে দেশ-বিদেশ থেকে ভারতে আসা প্রত্যেককেই আইসোলেশন ক্যাম্পে পাঠানো জরুরি ছিল। কিন্তু, আমাদের বিমানবন্দরে কর্মীরা জ্বর ও সামান্য স্বাস্থ্য দেখে ছেড়ে দিয়েছিলেন। যা উচিত হয়নি। এখানেই আমাদের ত্রুটি ছিল। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, যদি কেউ সংক্রমিত হয়, তাহলে সংক্রমণের লক্ষণ তৎক্ষণাৎ বোঝা যায় না। লক্ষণ দেখা দিতে ৪-৫ দিন অথবা ১০ দিনও লেগে যেতে পারে। ওই পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে আগত যাত্রীদের তাঁদের বাড়িতে যেতে দেওয়াই সবথেকে বড় ভুল ছিল। এই কারণেই এই ভাইরাস দেশের বিভিন্ন রাজ্যে-বিশেষ করে কেরল ও মহারাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খন্ড এবং ওড়িশাতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।২৪ মার্চ ঘোষিত এই লকডাউন নিয়ে সমালোচকদের সংখ্যাও কম নয়। এখনও বিভিন্ন ধরনের কথা বলা হচ্ছে। তাঁরা বলছে, লকডাউনের ফলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আরে ভাই, জব জান হে তভী জাহান হে। জীবিত থাকলেই তো অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে পারবেন। গোটা বিশ্বে যখন অর্থনীতি ধীর গতিতে চলছে, তখন আমরাও কিছু দিন সহ্য করতে পারব। তাঁরা বলছে, ২১ দিন তো অনেক বেশি দিন। মানুষজন আগে সন্তানদের জন্য বাড়িতে থাকার সময় পেত না, এখন যখন বাড়িতে থাকার সময় পেয়েছে, তাতেও তাঁদের সমস্যা। আগে সন্তান-স্ত্রীর জন্য সময় হত না, এখন সন্তান-স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটাতে তাঁদের বিরক্তি লাগছে। এটাও বলা হচ্ছে, দরিদ্র মানুষ এবং শ্রমিকদের কী হবে? দরিদ্র, শ্রমিকদের জন্য যারা মিথ্যে কাঁদছেন, তাঁরা বলুন তো পূর্ব উত্তর প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খন্ড ও ওড়িশার কয়েক লক্ষ শ্রমিক মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু এবং গুজরাটের মতো রাজ্যগুলিতে কাজ করার জন্য যান, তাঁরা কি দশেরা, দীপাবলি, ভাই ফোঁটা এবং ছট উদযাপন করতে বাড়িতে ফেরেন না? প্রতি বছরই তাঁরা বাড়িতে ফেরেন এবং তিন সপ্তাহের মধ্যে কেউ ফেরেন না। এটা তাঁদের কাছে কোনও ব্যাপার নয়। সমালোচকরা অবশ্যই পার্থক্য তৈরি করছে। তাঁরা বুঝতে পারছেন না, এই মহামারী যদি ভারতের মতো দেশে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে হতাহতের সংখ্যা কয়েক লক্ষে পৌঁছে যাবে।এই ধরনের সমালোচকদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয় জনগণের। দেশবাসী যখন মোদীজির উপর ভরসা রেখেছেন, তাই এই সঙ্কটের মুহূর্তে একত্রিত হয়ে নেতার কথামত চললেই সবার ভালো হবে। এটি একটি যুদ্ধ এবং সেনাপতির উপর সম্পূর্ণ আস্থা না থাকলে যুদ্ধ কীভাবে  জিতবেন? আসুন মোদীজির কথা এবং তাঁর নির্দেশিকা অনুসারে এগিয়ে চলি। মোদীজি যেমন বিশ্বাস রেখেছেন, ২১ দিনের মধ্যেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণের চেন যদি ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়, তাহলে শীঘ্রই আমরা সাধারণ জীবনে ফিরে আসতে সক্ষম হব।

Loading...