বাড়ি ফিরে দেখা আজও রাঢ় বাংলায়, বৃষ্টির আহ্বানে লোক দেবতার পুজো হয়!

আজও রাঢ় বাংলায়, বৃষ্টির আহ্বানে লোক দেবতার পুজো হয়!

573
0

রাধামাধব মণ্ডল : যখনই প্রকৃতি রুষ্ট হয়েছে, তখনই বিপর্যয় নেমেছে দেবভূমিতে। এ সত্য ও লোক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেই আদিম পৃথিবীর মানুষ করেছে রুষ্ট হওয়ার ভয়ে সেই সব দেব দেবীর পুজো। শিলা রূপী নারায়ণের, গাছ রূপী ব্রহ্মা , বজ্র রূপী ইন্দ্রজিৎ কিংবা বৃষ্টির দেবতা বরুণের পুজো করে এসেছে এ ভূভাগের মানুষ। এই বিঙ্গানের যুগেও যুক্তি তর্কের মানুষ কেবলই লোকবিশ্বাসে খোঁজেন আশ্রয়। এই বঙ্গ বা বাংলাদেশ খুবই প্রাচীন। ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে সর্ব প্রথম এই বাংলাদেশের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। রামায়নের মতো মহাকাব্যের পাতাতেও বঙ্গজনদের উল্লেখ মেলে। এছাড়াও “বৃহৎ সংহিতা” ও “দিগ্বিজয় প্রকাশ” ইত্যাদি গ্রন্থেও বঙ্গদেশের উল্লেখ মেলে। পরবর্তী কালে পাল ও সেন আমলের বহু লিপিমালায়, যেমন একাদশ শতকে বিজজল কলচুর্যের অবলুর লিপি, রাজেন্দ্র চোলের তিরুমলয় লিপি এবং দক্ষিণের কিছু লিপিতেও বঙ্গাল দেশ ও তার সংস্কৃতির উল্লেখ রয়েছে। এই থেকে অনুমেয় এই দেশ ও তাঁর লৌকিক উৎসব এবং সংস্কৃতিও খুব প্রাচীন। মধ্যযুগের শেষ ভাগে রচিত বাংলার মানিক চন্দ্র রাজার গানে, ভাটির অধিবাসীদের “বাঙ্গাল” বলা হয়েছে। সেখান কার কিছু পদে প্রকৃতির নানা ঘটনায়, বিনাশের ভয়ে লৌকিক দেব দেবীর পুজোতে মেতেছে। সুন্দর বনের বন বিবি তারই নামান্তর। যেমন কৈবর্তদের পুজিতদেবী শাকম্ভরী নামে এক লৌকিক দেবী, আজও বর্ধমানে নানা উপাচারে পূজিত হয়ে থাকেন। ১৮০৬ খ্রিঃ ৯ই অক্টোবরের এক আদেশ নামায় অজয় নদের প্রবাহ পথটি বর্ধমান জেলার উত্তরাংশের পশ্চিম ভাগ ও বীরভূম জেলার দক্ষিণাংশের সীমারেখা রূপে চিহ্নিত হয়েছিল। সেই সময়েই হিন্দু ধর্মের অন্তজ্য শ্রেণির মানুষজনেরা নানান প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে বাঁচতে, বিভিন্ন দেব দেবীর পুজোতে মেতেছে। সে ইতিহাস আজও অজয়, দামুদর, ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে বিদ্যমান। যেমন ১৩ ই বৈশাখ, ডোমেরা যে দিন কালু ডোমের পুজো করে, সে দিনই কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাত থেকে বাঁচতে, ওই নতুন মেঘের দিনই বাঙালীরা বাড়ি বাড়ি শ্যাওড়া ডাল দেওয়ার রীতি রয়েছে। গ্রীষ্মের জৈষ্ট্য মাসে প্রতি হিন্দু ধর্মের এহতি মহিলারা জয়মঙ্গলবার করে স্বামীর মঙ্গল কামনায়। বাংলার নানা প্রান্তে গ্রীষ্মের হাত থেকে বাঁচতে, বৃষ্টির জন্য মুসলমান সমাজের ফকির সম্প্রদায়ের লোকজনরা বাড়ি বাড়ি জলের আহ্বানে গৃহস্তের দরজায় দরজায় গিয়ে, চাল টাকার বিনিময়ে, গড়াগড়ি দেওয়ার রীতি রয়েছে আজও। এছাড়াও রাঢ় বাংলায় বৃষ্টির জন্য গ্রাম্য দেব দেবীকে চৈত্র সংক্রান্তির দিন মুনুই, মচ্ছব দেওয়ার রীতি রয়েছে। মান্নাবুড়ো, সরু বুড়ো, গৌতম গোঁসাই এদিন কৃষকের পরিবারের হাতে পুজো পান, বৃষ্টির আহ্বানে। শুধু তাই নয়, রাঢ় বাংলার বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, হুগলী, নদীয়া, বীরভূম, বর্ধমান জেলায় একযোগে আজও গ্রীষ্মের দিনে জলের আহ্বানে, ইন্দ্রজিৎ দেবতাকে আহ্বান করতে নারদ মুনির পুজো করে, গ্রামের বাইরে মাঝ মাঠে। রীতি নীতির এই বাংলায় আজও সংস্কারের জন্য টিকে রয়েছে নানান অপদেবতা, ডাকিনী যোগিনীর সঙ্গে সঙ্গে লৌকিক গ্রাম্য দেব দেবীরা। আদিবাসীরা বৃষ্টির আহ্বানে মোড়গ কাটে, শাল গাছের নীচে। তারপর পালা বা পল্লব কে পুজো করায়, মোড়লকে দিয়ে। এই তাদের রীতি।গ্রীষ্মের বেশকিছু রোগ থেকে বাঁচতে আজও গোটা গ্রীষ্মের দিন নিরামিষভোজী আহার করে হিন্দু ধর্মের মানুষেরা। এছাড়াও জল বসন্ত, আন্ত্রিকের মতো জল বাহিত রোগ থেকে বাঁচতে মা শীতলা, মনসার পুজোও করে। বিঙ্গানের আহ্বানে সারা দিয়ে অসুধও খায়।রাজা বল্লাল সেনের আমল থেকে রাঢ় বাংলার বেশকিছু অঞ্চলে কৃষকের আদরের হাল, লাঙ্গল কে পুজো করার রীতিও চালু আছে। এই অঞ্চলের কৃষক শ্রেণির মানুষের বিশ্বাস, লাঙল কে পুজো করলে, মাঠে গ্রীষ্মের দাবদাহ কেটে বৃষ্টি নামবে। এবং বর্ষার আগমনে স্বাভাবিক সবুজে ভরে উঠবে মাঠ। আজও বর্ধমান জেলার বেশ কিছু এলাকায় বৃষ্টির জন্য, গ্রাম বাইরে ঈশ্বর বৃক্ষের নীচে সাধক সন্ন্যাসী নিয়ে এসে খাল কেটে দীর্ঘদিনের যোগ্য করা হয়। লোক বিশ্বাস তাতেই নাকি বৃষ্টি শুরু হবে।

Loading...