বাড়ি অন্যান্য অনলাইন পাঠ দান, মূল সমস‍্যাগুলো কোথায়

অনলাইন পাঠ দান, মূল সমস‍্যাগুলো কোথায়

46
0

কলকাতা, ৮ জুলাই  : লকডাউনে অনলাইনের মাধ্যমে চলছে সিলেবাস শেষের পালা। কলকাতার নামীদামী স্কুল কলেজের অনলাইনে পড়াশোনা নিয়ে চর্চা হয়েছে। কিন্তু একটু দূরের স্কুলগুলোর পড়ানো চলছে কীরকম?

করোনার প্রাদুর্ভাব পর্বে রাজ্য সরকার পড়ুয়াদের পড়াশোনার যে-ব্যবস্থা করেছে, শিক্ষা দফতরের পুস্তিকা ‘এডুকেশন ফার্স্ট’-এ তার খতিয়ান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সেই উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে? অনলাইন ক্লাসে মধ্যমেধার পড়ুয়ারাই বা উপকৃত হচ্ছে কতটা? শিক্ষা শিবিরের অনেকেরই বক্তব্য, অনলাইন-পাঠের সরঞ্জাম আছে, শহরাঞ্চলের এমন সম্পন্ন পরিবারের ছেলেমেয়েরা এই ব্যবস্থায় কমবেশি উপকৃত হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু গ্রাম বা প্রত্যন্ত এলাকার অধিকাংশ পড়ুয়া এর সুফল পাচ্ছে না। পরিকাঠামোর অভাব ছাড়াও শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুখোমুখি শিক্ষণ প্রক্রিয়ার অনেক মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা এতে নেই।
শ্রেণিকক্ষে মুখোমুখি পড়ানোর মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা আর অনলাইনে পরোক্ষ-পাঠের অসুবিধা ব্যাখ্যা করেছেন উত্তরপাড়া গভর্নমেন্ট হাইস্কুলের সহকারী শিক্ষক ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারি বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৌগত বসু। তিনি বলেন, ‘‘ক্লাসরুমে মধ্যমেধার কোনও পড়ুয়া ঠিকমতো পড়া বুঝতে না-পারলে অভিজ্ঞ চোখে শিক্ষক সেই পড়ুয়ার মুখ দেখেই তা বুঝে ফেলেন। অনলাইনে শিক্ষকের পক্ষে সেটা বোঝার সম্ভাবনা কম। তা ছাড়া ক্লাসে ঠিকমতো বুঝতে না-পারলে আরও ভাল করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ছেলেমেয়েরা অনুরোধ করে। অনলাইন ক্লাসে সব সময় সেই অনুরোধ করার সুযোগ থাকে না। এর ফলে মধ্যমেধার পড়ুয়াদের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়তেই থাকে।’’
করোনার দৌরাত্ম্য ছাড়াও রাজ্যের কয়েকটি জেলায় ঘূর্ণিঝড় আমপানের হানায় অনেক ছাত্রছাত্রী ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ের আগে অনলাইন শিক্ষার সুযোগ যতটুকু মিলছিল, বহু পড়ুয়া সেটাও হারিয়েছে বলে মনে করছেন অনেক শিক্ষক।চন্দননগর কলেজের বরিষ্ঠ শিক্ষিকা সঙ্গীতা ত্রিপাঠি মিত্র এই প্রতিবেদককে জানালেন,  ইন্টারনেট পরিষেবা সর্বত্র ও সর্বক্ষণ সুলভ নয়। ছাত্ররা সবাই আধুনিক প্রযুক্তি ব‍্যবহারে সক্ষম (আর্থিক ভাবে) ও স্বচ্ছন্দ নয়। হোয়াট্স এ্যাপ এর মাধ্যমে পড়াচ্ছি। সমস‍্যা হল রেকর্ড করে পড়ার জিনিস পাঠাচ্ছি। অনেক সময়  সময়মত যাচ্ছে না। ছাত্রদের বক্তব‍্যও সঠিক ভাবে আসছে না। চ‍্যাটের মাধ‍্যমে প্রশ্ন উত্তর এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। 
অভিজ্ঞ শিক্ষিকা সঙ্গীতাদেবীর কথায়, “সব থেকে বড় কথা একটানা একতরফা পড়ানোয় ছাত্রদের সঙ্গে  যোগাযোগ সরাসরি হয় না। থমকে থমকে হওয়ায় পড়ানোয় স্বতস্ফূর্ততা থাকে না। আর পড়ানোর উদ্দেশ‍্য তো শুধু সিলেবাস শেষ করা  নয়! ছেলেদের মনটাকেও তৈরী করা। ঠিক সুরে বেঁধে দেওয়া। তাদের মুখোমুখি না পেলে তো তা সম্ভব নয়। অনলাইন পদ্ধতিতে পাঠ দান এর প্রধান অন্তরায়। একজন শিক্ষিকা হিসেবে এইটাই প্রধান সমস‍্যা বলে মনে হয় আমার।
পূর্ব বর্ধমানের জামড়া জুনিয়র হাই স্কুলের শিক্ষক সৌমেন দে এই প্রতিবেদককে জানান, “বর্তমান পরিস্থিতি ছাত্র-শিক্ষক উভয়কেই এক অভিনব পরীক্ষার সামনে এনে ফেলেছে। যার নাম অনলাইন ক্লাস । দুই পক্ষেরই পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাব। ফলে অসুবিধা সকলেরই কম-বেশি হচ্ছে। আর আমার মত যে সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকার গ্ৰাম‍্য এলাকায় স্কুল, তাঁদের কাছে অনলাইন ক্লাসের আয়োজন করাটাই একটা বিরাট সমস্যা। কারণ ছাত্র-ছাত্রীদের বেশিরভাগের বাড়িতেই স্মার্টফোন নেই। ফলে শহুরে এলাকায় অনলাইন ক্লাস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হলেও, এই রাজ‍্য বা দেশের এমন বহু এলাকা আছে, যেখানে অনলাইন ক্লাস কখনই মূল ক্লাসরূম শিক্ষনের বিকল্প হতে পারে না। সে আমরা যতই তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে এগিয়ে গিয়ে থাকি না কেন।অনলাইন ক্লাসের সুফল সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হলে, আমাদের আরও পথ হাটতে হবে। এই উপলব্ধিটাই গত ২/৩ মাস ধরে আমার হয়েছে-যেখানে আমি রোজ দেখছি, আমার বাড়ির আশেপাশের ছেলে-মেয়েরা অতি সহজেই অনলাইন ক্লাস করছে, আর আমরা আমাদের স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন‍্য সেই রকম কোনও ব্যবস্থা করতে পারছি না। বাস্তবিকই, শিক্ষা/শিক্ষাব্যবস্থা এই কয়েক মাসে বৈষ‍ম‍্যমূলক হয়ে উঠেছে। 
বীরভূমের নলহাটির আমুড্ডা জুনিয়র হাইস্কুলের শিক্ষিকা তনয়া মুখোপাধ্যায় এই প্রতিবেদককে জানান, “বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজন, তা নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁদের  বক্তব্য পেশ করছেন বেশ কিছু দিন ধরেই। আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত হল, বর্তমানে কোনও ভাবে পড়ুয়াদের পঠনপাঠনের জন্য বিদ্যালয়ে আসতে বলা সম্ভব নয়। ফলে, বিদ্যালয়ে না এসে পড়াশোনা চালু রাখা একমাত্র সম্ভব অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে। বাড়িতে থেকেও তারা এই ক্লাসগুলির ফলে তাদের বিভিন্ন বিষয় সংক্রান্ত প্রশ্ন, তাদের শিক্ষকদের করতে পারবে। ক্লাসের শেষে শিক্ষকরা যে সব কাজ তাদের দেবেন, সেগুলো ও তারা সহজেই সমাধান করতে পারবে। আমাদের চার বছরের কন্যা, যে নিকটবর্তী একটি প্রি-স্কুলে পড়ে, এখন সপ্তাহে তিন দিন করে অনলাইন ক্লাস করছে। 
অনলাইন ক্লাস এর এই ভালো দিকগুলো থাকলেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।  আমার মত যে সব শিক্ষকদের বিদ্যালয় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে, যেখানে বেশিরভাগ পড়ুয়াই প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। তাদের কাছে অনলাইন ক্লাস বিষয়টি খুবই সমস্যার। তাদের অনেকেই এই সংক্রান্ত বিভিন্ন অ্যাপের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জানেনা। অভিভাবকদের থেকে কোনও প্রকার সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাও তাদের নেই। আবার অনেকের কাছে স্মার্ট ফোনও নেই, যার মাধ্যমে তারা এই ক্লাসে যোগ দিতে পারে।  আমাদের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই ক্লাসগুলো কতটা ফলপ্রসূ হবে, সে উত্তর সময়ই দেবে।“

Loading...