বাড়ি ভ্রমণ ৫১ সতীপীঠের অন্যতম কামাখ্যা

৫১ সতীপীঠের অন্যতম কামাখ্যা

250
0

কামাখ্যা মন্দির গুয়াহাটি শহরের পশ্চিমাংশে নীলাচল পর্বতে অবস্থিত। এটি ৫১ সতীপীঠের অন্যতম। এই মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যার মন্দিরও আছে। অর্থাত্ ভুবনেশ্বরী, বগলামুখী, ছিন্নমস্তা, ত্রিপুরাসুন্দরী, তারা, কালী, ভৈরবী, ধূমাবতী, মাতঙ্গী ও কমলা—এই ১০ দেবীর মন্দিরের দেখা মিলবে এখানে। এর মধ্যে ত্রিপুরাসুন্দরী, মাতঙ্গী ও কমলা প্রধান মন্দিরে পূজিত হন। হিন্দুদের বিশেষত তন্ত্রসাধকদের কাছে এই মন্দির একটি পবিত্র তীর্থ। গুয়াহাটি যাওয়ার রাস্তাটা সুন্দর, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একটা আলপিন পড়ে থাকলেও খুঁজে পাবেন। আমরা কামাখ্যা মন্দিরের গেটে এসে পৌঁছালাম। বেশ সুন্দর স্থাপত্যশৈলী। কামাখ্যা গেট থেকে মন্দিরের কাছে যেতে সময় লাগল পাঁচ মিনিট। আঁকাবাঁকা চড়াই পথ ধরে ওপরে ওঠার সময় গৌহাটি শহর দেখতে পেলাম। মন্দিরসংলগ্ন এলাকা বহু মানুষের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে আছে। গাড়ি থেকে নেমে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করলাম। অভিনব স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি কামাখ্যা মন্দিরগুচ্ছকে ঘিরে আছে সুন্দরভাবে বাঁধানো চাতাল। মন্দিরগাত্রে শোভা পাচ্ছে দেবদেবী এবং নারী-পুরুষের মূর্তি। মন্দির পরিসরে বেশির ভাগ পান্ডা ব্যস্ত তাদের যজমানদের নিয়ে। বাকিরা ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে থেকে দিব্যি আড্ডা দিচ্ছে। কামাখ্যার পাণ্ডাদের পরনে লাল বসন, গলায় একাধিক রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে বড় লাল টিপ। মন্দিরের ভেতরে আপনি ক্যামেরা নিয়ে ঢুকতে পারবেন না।  একজন পান্ডা ঠিক করলাম। তাকে কিছু টাকা দিলাম পূজার দ্রব্যাদি কেনার জন্য। তিনি নিয়ে চললেন।

প্রথমে একটা লোহার ব্রিজ পেরিয়ে মন্দিরের দিকে ধাবিত হলাম। পান্ডা মন্দির সংলগ্ন সৌভাগ্যকুন্ডে গিয়ে কুন্ডের জল আমার গায়ে ছিটিয়ে দিলেন আর কি জানি মন্ত্র পরলেন। একদিকে কুণ্ডের জ্বলে সবাই সিক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ডানপাশে অবস্থিত গণেশের মূর্তিতে পূজা দিচ্ছে। আমরা মূল গর্ভ গৃহে প্রবেশের লাইনে দাঁড়ালাম। সবার হাতে পূজা দেবার দ্রব্যাদি। পান্ডার হাত ধরে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে অদ্ভুত পরিবেশ। ধূপের গন্ধ, ফুলের সৌরভ, নিভে যাওয়া মোমবাতি এবং প্রদীপের গন্ধ, ভক্তদের দেবী বন্দনা, পাণ্ডাদের মন্ত্রপাঠ, দলবিচ্ছিন্ন মানুষদের ডাকাডাকি, চেঁচামেচি—সব মিলিয়ে এ যেন অন্য কোনো জগত্। মূল গর্ভগৃহ অন্ধকার। প্রদীপের আলোয় খুব কম সময়ের জন্য দেবী দর্শন করে বের হলাম। পান্ডার মতে, প্রাকৃতিক এক রহস্যময় গুহাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই কামরূপ কামাখ্যা মন্দির। সিংহাসনে আসীন অষ্টধাতুর কামাখ্যা দেবীর বিগ্রহ দেখিয়ে বলল, একসময় এ জায়গায় কেউ গেলে নাকি আর ফিরে আসত না। হাজার বছরের রহস্যময় স্থান এই কামরূপ কামাখ্যা। এখনো জাদুবিদ্যা সাধনার জন্য বেছে নেওয়া হয় কামাখ্যা মন্দিরকেই। কামরূপ কামাখ্যার আশপাশের অরণ্য আর নির্জন পথে নাকি ঘুরে বেড়ায় আত্মারা। কামাখ্যা মন্দিরে চারটি কক্ষ—গর্ভগৃহ ও তিনটি মণ্ডপ (যেগুলোর স্থানীয় নাম চলন্ত, পঞ্চরত্ন ও নাটমন্দির)। গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। এগুলোতে খাজুরাহো বা অন্যান্য মধ্যভারতীয় মন্দিরের আদলে নির্মিত খোদাইচিত্র দেখা যায়।মন্দিরের বাইরে এলাম আমরা পায়ে হেঁটে। দেখি পাহাড়ের ওপর থেকে ব্রহ্মপুত্রের প্রবহমান পথ, নদীতীরবর্তী বিভিন্ন ঘাট এবং গুয়াহাটি শহর। একটা আশ্রমে ঢুকতেই দেখি এক সন্ন্যাসী বড় একটি সাপ নিয়ে বসে আছেন। পান্ডা আমাকে কাছে টেনে বলল, সাপ দেখে ভয় পাচ্ছেন কেন। আমরা তো সাপ নিয়ে খেলাধুলা করি। চলুন, আখড়ায় খাওয়া-দাওয়া করে নিন। গরম গরম খিচুরি, ছানার তরকারি, সবজি আর পায়েস। অসাধারণ স্বাদ। খাওয়া শেষে শ্মশানঘাটের পরে এক জঙ্গলে নিয়ে গেল পান্ডা । এখানেই নাকি জাদুটোনা হয়। সন্ধ্যা হওয়ার পরে এ পথে কেউ আর আসতে চায় না। শ্মশানে বসে কারা যেন ভয়ভীতি  দেখায়। তাদের চেহারা ভয়ানক বিদঘুটে। শুনে আমারই পিলে চমকে ওঠে।

Loading...