বাড়ি ফিরে দেখা ১০০ তম জন্মদিবসের আলোকে পণ্ডিত রবি শঙ্কর

১০০ তম জন্মদিবসের আলোকে পণ্ডিত রবি শঙ্কর

202
0


ভারতীয সঙ্গীতে বিশেষ করে শাস্ত্রীয এবং ধ্রুপদী সঙ্গীতের অন্যতম বিশ্ব প্রতিনিধি ছিলেন রবি শঙ্কর| বহু কষ্ট করে তিনি সঙ্গীত সাধনায উত্তীর্ণ হন| তাঁর গুরু পণ্ডিত আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব তাকে কোনও সমযে বঞ্চিত করেননি| তার একটি মাত্র কারণ শিষ্য রবি শঙ্কর ছিলেন একেবারে তাঁর কাছে পুত্রের মতো| পুত্রের মতো করে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব তাঁকে সঙ্গীত শিখিযেেন এবং মার্গ সঙ্গীত সম্পর্কে বহু তথ্য তাঁকে তুলে দিযেেন নিজের হাতে করে| ব্রিটিশ রাজশক্তি ভারতীয সঙ্গীতকে মর‌্যাদা দিতে শুরু করে| তার কারণ হচ্ছে এই প্রাচীন সভ্যতার দুটো মহাকাব্য রামাযণ এবং মহাভারত এর পাশাপাশি ছিল উন্নতমানের সংস্কৃˆতি জগত্ যা সারা ইউরোপে মেলা ভার ছিল| রানি ভিক্টোরিযা থেকে শুরু করে রানি এলিজাবেথ পর‌্যন্ত সমস্ত রাজপরিবারের সদস্যরা ভারতীয সঙ্গীতে মুগ্ধ ছিলেন| ভারতের ভাইসরয থেকে শুরু করে ছোটলাটরা পর‌্যন্ত ভারতীয সঙ্গীতের ভক্ত ছিল| লর্ড ক্লাইভ বাংলা জয করে ভারতীয সঙ্গীতের প্রতি প্রীতি  আকর্ষন বোধ করেছিলেন| রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বাড়িতে দুর্গা পুজোর সমযে বহু সঙ্গীত শিল্পীরা অংশ গ্রহণ করতো| লর্ড ক্লাইভ রাত পর‌্যন্ত সেই সঙ্গীত শিল্পীদের গান শুনতেন মনোযোগ সহকারে| ভারতের সঙ্গীত জগত যুদ্ধ করে না করে বিশ্ব জয করে নিযেিল| গ্রীক সভ্যতা যেমন রোমকে প্রভাবিত করেছিল ঠিক তেমনি পণ্ডিত রবি শঙ্করের সেতার বিশ্বকে প্রভাবিত করে| আসলে সঙ্গীতের সুরে বাধা ছিল রবি শঙ্করের মন| সেখান থেকে তিনি কোনও সমযে একটুও সরে যাননি| জীবনে বহু কষ্ট পেযেেন| কিন্তু সুরকে তিনি মনের গভীরে স্থান দিযেিলেন সেটা ৱুঝতে পেরেছিলেন তাঁর গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন| গুরু কন্যা অন্নপূর্ণাকে তিনি বিবাহ করলেন| আপত্তি করেননি গুরু আলাউদ্দিন| বরং উত্সাহিত হযেিলেন| একজন প্রকৃত সঙ্গীত প্রেমীর সঙ্গে তাঁর মেযে বিযে হওযাতে| রবি শঙ্কর যেসব স্থানে ভুল করতেন সেই সব স্থাগুলোকে ঠিক করে দিতেন স্ত্রী| স্ত্রীও সঙ্গীতকার ছিলেন| তিনি ভালো বাজাতেন| স্বামী সঙ্গীত চর্চা করতো বলে তিনি কোনও দিন প্রকাশ্যে এসে সেতার ধরেন নি| স্ত্রীর সঙ্গে সারা রাত ধরে রবি শঙ্কর রেওযাজ করতেন| কখন যে ভোর হযে যেত তা তারা ৱুঝতে পারতেন না| আসলে রবি শঙ্কর ৱুঝতে পেরেছিলেন তাঁর সঙ্গীত জীবন পূর্ণতা লাভ করবে যদি তিনি গুরু কন্যাকে বিবাহ করেন| দুই জনের মধ্যে তৈরি হযে গিযেিল একটি নিবিড় প্রেম| সেই প্রেম পরবর্তীকালে বিবাহতে পরিণত হয| আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব কন্যাকে ধ্রুপদী সঙ্গীতে তালিম দিযেিলেন| তিনি যেমন রবি শঙ্করকে সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ করে দিযে গিযেিলেন ঠিক তেমনি কন্যাকেও তিনি সঙ্গীত রূপকার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে যান| কিন্তু কন্যা অন্নপূর্ণা স্বামী রবি শঙ্করের জন্য কোনও দিনও প্রকাশ্যে এসেননি| তিনি স্বামীর সঙ্গে ধ্রপদী সঙ্গীত সঙ্গত করতেন বটে| কিন্তু বর্হিজগতের সঙ্গে তার কোনও পরিচয ছিল না| উদয শঙ্করের আলমেড়া কেন্দ্র ভেঙে যাওযার পর আন্ধেরিতে চলে আসেন তিনি| সেখানে তাদের শিশু পুত্র ঘুমাতো পাশে| স্বামী স্ত্রী দুইজনে মিলে সারা রাত ধরে সঙ্গীতে তামিল দিত| রবি শঙ্কর যখন প্রথম তাঁর রিবার নিযে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন তখন তাদের খাবার ব্যবস্থা ছিল না| থাকার জাযগা ছিল না বলতে গেলেই চলে| পরের দযাতে তারা থাকতো এবং খেতো| স্ত্রী অন্নপূর্ণ সঙ্গীত বিশারদ হযে তিনি নিজেই জামা কাপড় কাচতেন| বাসনকোসন মাজতেন| একেবারে ঘরের বৌ হযে দিন কাটাতেন| তাতে তার কোনও অভিযান দেখতে পাওযা যাযনি| সব কিছু তিনি সহ্য করতেন স্বামী রবি শঙ্করকে বিশ্ব সঙ্গীত শিল্পী হিসাবে দেখতে পাওযার জন্য| এর জন্যই স্ত্রী সারা জীবন ধরে সংগ্রাম করে গিযেিলেন| রবি শঙ্কর পরিস্কার করে ৱুঝতে পেরেছিলেন যে আমেরিকাতেˆ গিযে তাকে উপস্থিত হতে হবে| আমেরিকা সারা বিশ্বকে পরিচালিত করে| রাজনীতি অর্থনীতি থেকে শুরু করে সমাজ নীতি পর‌্যন্ত আমেরিকা বিশ্বকে পরিচালিত করতে সক্ষম| স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকার শিকাগোতে গিযে ধর্ম মহাসম্মেলনে বক্তব্য রাখতে পেরেছিলেন বলেই তার নাম সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িযে পড়ে| রবি শঙ্কর স্বামী বিবেকানন্দের পদাঙ্ক অনুসরণ করার দিকে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন| স্বামী বিবেকানন্দ যেমন ধর্ম নিযে উপস্থিত হযেিলেন আমেরিকাতে ঠিক তেমনি রবি শঙ্কর উপস্থিত হলেন আমেরিকাতে ভারতীয ধ্রুপদি সঙ্গীতকে সঙ্গে নিযে কমিউনিস্ট পার্টির একটি কমিউনে বসবাস করতে শুরু করেন রবি শঙ্কর মুম্বইতে| কমিউনিস্ট পার্টির সন্ট্রাল কালচারাল স্কোযাড| এই স্কোযাডে বেশিদিন ছিলেন না রবি শঙ্কর| তিনি আইএনটি’র ‘ডিসকভারি অব ইণ্ডিযা’র প্রযোজনায সঙ্গীত পরিচালনার দাযিত্ব গ্রহণ করে চলে গেলেন| স্কোযাডে থাকার সমযে রবি সঙ্কর ইকবালের লেখা একটি গানের সুর দিযে গিযেিলেন| সেই গানটি আজও বিশ্ববিখ্যাত| গানটি হচ্ছে-‘সারে জাহঁ সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা|’ গজল ধাঁচে সঙ্গীতটি নির্মিত| পরিচালক সত্যজিত্ রাযে দৃষ্টিতে পড়ে গিযেিলেন রবি শঙ্কর| পথের পাঁচালি থেকে শুরু করে অপরাজিতা, অপুর সংসার ছবিতে তিনি সুর দিযেিলেন| যদিও সত্যজিত্ রায সুরকে বেধে দিযেিলেন| কিন্তু শিল্পীর স্বাধীনতাকে কোনও সমযে ক্ষুন্ন করেননি পরিচালক সত্যজিত্ রায| তিনি রবি শঙ্করকে  সুর তৈরি করার স্বাধীনতা দিযেিলেন| তবে সুরকে ছবির সিকোযে্সে বসানোর আগে সত্যজিত্ রায সেটা আগে শুনতেন| কোথায কোনও সুরকে সঠিকভাবে বসাˆতে হবে সেটা তিনিই ঠিক করতেন| জলসা ঘর ছবিতে রবি শঙ্কর সুর দিযেিলেন| সত্যাজিত্ রায যেসব ক্লাসিক্যাল ছবি তৈরি করেছেন সেইগুলোতে সুর দিতে ডাক পড়তো রবি শঙ্করের|  রবি শঙ্করের দুই কন্যা আজও পিতার পদাঙ্ককে অনুসরণ করে চলেছেন| একজন হচ্ছেন নোরা জোন্স এবং পরজন হচ্ছেন অনুষ্কা শঙ্কর| ভারতীয ধ্রুপদী শিল্পকে এরাই এখন বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত| কন্যা নোরা জোন্স পেযেেন গ্রামি পুরস্কার | অনুষ্কা শঙ্করও কিন্তু কম যান না| তিনিও বহু পুরস্কাররে ভূষিত| রবি শঙ্কর জন্ম গ্রহণ করেন ৭ এপ্রিল ১৯২০ সালে| রবি শঙ্করের পুরো নাম ছিল রবি শঙ্কর চৌধুরী| জন্ম উত্তর প্রদেশে বেনারস শহরে| বেনারস শহর শিল্পীদের স্থান হিসাবে বিখ্যাত| এখানে সানাই শিল্পী বিলাযে্ খাঁ জন্ম গ্রহণ করেছিলেন| বাবা শ্যাম শঙ্কর চৌধুরী ছিলেন আইনজ্ঞ| মা হেমাঙ্গিনী তাঁকে বড় করেন| ১৯৩০ সালে মাযে সঙ্গে প্যারিসে যান| পরবকর্তীকালে আলাউদ্দিন খাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তাঁর কন্যাকে বিবাহ করেন| পরে তিনি আবার আমেরিকার কনসার্ট উদ্যোক্তা সু্য জোন্স সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠার ফলে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন| তার নাম হয নোরা জোন্স| এখনও এই নোরা জোন্স প্রথিতযশা জ্যাজ, পপ, আধ্যাত্মিক এবং লোক সঙ্গীত শিল্পী| নোরা জোন্স ২০০৩ এবং ২০০৫ সালে দশটি গ্রামি পুরস্কার পেযেেন| রবি শঙ্কর আবার তৃতীযবার পাণিগ্রহণ করেন| তাঁর অনুরক্তা সুকন্যা কৈতানকে বিবাহ করেন|  এই বিযেে তার দ্বিতীয কন্যা অনুষ্কা শঙ্করের জন্ম হয|  ১৯৬৬ সাল থেকে তিনি বিটলসের জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে সঙ্গীতে বিভিন্ন ধারা নিযে কাজ করেছেন| বেহালা বাদক ইহুদি মেনুহিনের সঙ্গে সেতার বেহালার কম্পোজিশন করেন| বাংলাদেশ স্বাধীনতার সমযে তিনি কনসার্ট অব বাংলাদেশ (১৯৭২) অনুষ্ঠানে সেতার বাজিযেিলেন| বহু আমেরিকাবাসীরা তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে| আজও আমেরিকাবাসীরা তাঁর নামকে স্মরণ করে রেখে দিযেে|  আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ছিলেন পণ্ডিত রবি শঙ্করের পরম ভক্ত| ১৯৯৯ সালে ভারতরত্ন পুরস্কার লাভ করেন| ২০০১ সালে রানি এলিজাবেথ তাঁকে নাইট উপাধি দেন| ১৪টি সম্মানসূচক ডক্টরেট় লাভ করেন| বিশ্বভারতীয তাঁকে দেশিকোক্তম প্রদান করে| জর্জ হ্যারিসন বলেছেন,‘ রবি শঙ্কর হচ্ছেন বিশ্ব সঙ্গীতের দেবপিতা’| ২০১২ সালে ১১ ডিসেম্বর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরলোকগমন করেন| তিনি রবি মতোই উজ্জ্বল আলোতে প্রকাশিত বলে মন্তব্য করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর| 

Loading...