বাড়ি ভ্রমণ মুশৌরির পথে পথে

মুশৌরির পথে পথে

234
0

দেরাদুন বাসস্ট্যান্ড থেকে উঠে পড়লাম সেই বাসেই। বেশ শীত শীত সকালে বাসে করে এগিয়ে চলেছি। এই বাসটির প্রথম গন্তব্য মুশৌরি। অনেকবার নাম শোনা আর খুবই জনপ্রিয় দারুণ একটি জায়গা মুশৌরি। সমতলে আর শহরের মোড়ে মোড়ে ১০ মিনিট চলার পরে পথের দুই পাশে কুয়াশার চাদর সরিয়ে পাহাড়ের সারি চোখে পড়ল প্রথমবারের মতো। তার মানে সামনেই পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে চলতে শুরু করবে আমাদের বাস। যেতে যেতেই রাজপথের দুই পাশে ফুটপাত দেখে অবাক হয়ে তাকাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম সেগুলো আসলে  ফুটপাত নাকি পার্ক? ছোট-বড় গাছ, মাঝেমধ্যে বসার জন্য স্টিল ও ইট-পাথরের রঙিন বেঞ্চ, ফুলের টব, জলের ফোয়ারা আর ঘনসবুজে ঘেরা। একটা পার্কের যেসব অনুষঙ্গ থাকা উচিত তার সবই আছে; কিন্তু সেসব এই ফুটপাতে কেন? মনের মধ্যে জিজ্ঞাসা উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করছিল। কিন্তু সেই জিজ্ঞাসা চাপা পড়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। বাস সমতল ছেড়ে পাইন বনে আচ্ছাদিত পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে চলতে শুরু করেছে। এই পথের পাহাড় যেন একটু বেশিই খাড়া। ছোট ছোট পাহাড়ের পিঠ কেটে কেটে বানানো হয়েছে গাড়ি চলার পথ। যে কারণে গাড়ি যখন বাঁক নেয় তখন এতটাই হেলে পড়ে যে প্রায় সিট থেকে ছিটকে পড়ে যাই যাই অবস্থা। একবার ডানে হেলে আর একবার বাঁয়ে হেলে, পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে, পাইনের বনের মাঝ দিয়ে কখন যে আমরা প্রায় মুশৌরির কাছাকাছি চলে এসেছি বুঝতেই পারিনি। পথের মাইলফলকে তেমনই লেখা দেখাল। আপাতত অপেক্ষায় কখন বাস মুশৌরি পৌঁছাবে। কত নাম শুনেছি এই পাহাড়ি শৈল শহরের, কত ছবি দেখেছি, কতজনের কাছে অল্প বিস্তর গল্প শুনেছি। আজ সেই শহরের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি। আর হয়তো কয়েকটা পাহাড়, কয়েকটি বাঁক। বাস এবার পাহাড়ের গা থেকে পিঠের পথ ধরে এঁকেবেঁকে চলতে শুরু করেছে যেন। কারণ নিচে অনেক ছোট ছোট পাহাড়ের মেলা দেখা যাচ্ছে। পাহাড় আছে দুই চোখের সবটুকু দৃষ্টিসীমার মধ্যেই। সামনে, পেছনে, ডানে, বামে আর ওপরে, নিচেও। সেই সব পাহাড়ে ওড়াউড়ি করছে কোথাও মেঘ, কোথাও কুয়াশা আর কোথাও মেঘ-কুয়াশার আলিঙ্গন। বর্ষা শেষেও পথের বাঁকে বাঁকে নানা আকার আর আকৃতির ছোট মাঝারি ঝরনার বয়ে চলা। কোনোটি পথের পাশ দিয়ে, কোনোটি পথের মাঝ দিয়ে আর কোনোটি দুই পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে। সেই সঙ্গে পাহাড়ে পাহাড়ে মেঘ-কুয়াশার লুকোচুরি। মানে কোনটি যে মেঘ আর কোনটি যে কুয়াশা ঠাহর করা মুশকিল।এসব পাহাড়, পাহাড়ে পাহাড়ে উড়ে বেড়ানো মেঘ, পাহাড়কে জড়িয়ে ধরা কুয়াশা দেখতে দেখতে কখন যেন চলে এসেছি মুশৌরিতে। বাসের হেলপারের ডাকে সংবিত্ ফিরে পেলাম। মুশৌরিতে ১৫ মিনিটে একটু ফ্রেশ হওয়া, হালকা চা আর কেক-বিস্কুট খাওয়া হলো এক পাহাড়ের ছাদে বসে। পাহাড়ের ছাদ বলতে ওই বাসস্ট্যান্ডটা এমন জায়গায় বানানো, যেখান থেকে নিচে কোনো গাছ বা মাটির ছোঁয়া দেখতে পাওয়া যায় না, শুধু দূরে পাহাড়ের হাতছানি ছাড়া। যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। ঠিক যেন এক পাহাড়ের ছাদে বসে বা দাঁড়িয়ে অন্য পাহাড়গুলোকে দেখে যাওয়া।

Loading...