বাড়ি ভ্রমণ পর্যটকনির্ভর এলাকা গোয়া

পর্যটকনির্ভর এলাকা গোয়া

86
0

ঘুম ভেঙেছে ছটায়। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বুক চিরে চলছে রেলগাড়ি। কুয়াশার কারণে খুব বেশিদূর দেখা যায় না। যতটা দেখা যায়, বনের গাছপালা শিশিরে ভিজে চকচক করছে। হঠাৎ ছোট একটি স্টেশনে দুম করে দাঁড়িয়ে গেল ট্রেন। ‘আদরাক কি চায়ে’ হাঁক ছেড়ে এক যুবক এগিয়ে আসছে, তাকে দেখেই কিনা একটা ছোট কাঠবিড়ালি পালিয়ে গেল। যাচ্ছি গোয়া, ভারতের সবচেয়ে ছোট্ট রাজ্য।বাইরের দৃশ্য দেখে মনে হলো, গোয়া এসে ভুল করিনি। মুম্বাই টু গোয়ার ট্রেনযাত্রাটাই অসাধারণ, পশ্চিমঘাটের বুক চিরে ছুটে চলা এই রেললাইন চালু হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ২৬ জানুয়ারি। কোঙ্কন রেলপথ নামে পরিচিত এই পথের বেশির ভাগই তৈরি হয়েছে পাহাড় আর জঙ্গল কেটে। রাস্তায় ঝরনা, জলপ্রপাত, অরণ্য ছাড়াও আছে অনেক টানেল। সবচেয়ে বড়টির দৈর্ঘ্য ৯ কিলোমিটার! গোয়া পর্যটকনির্ভর এলাকা। স্থানীয় ট্যাক্সিচালকদের সুরক্ষা দিতে সেখানে উবার, ওলার মতো শেয়ারিং রাইডের অনুমতি নেই। সব জায়গায়ই প্রিপেইড ট্যাক্সি। ভাড়া অনেকটা বেশি। স্টেশন থেকে ৪৫ মিনিটের দূরত্বে আমাদের নিবাসে এসে গুনতে হলো ৯০০ টাকা! ভাড়ার দুঃখ ভুলিয়ে দিল পথের দুই পাশের সৌন্দর্য। নদী আর জঙ্গল, কোথাও তৈরি হয়েছে খাঁড়ি, কোথাও জলাবন। আপনি যদি দীর্ঘ যাত্রায় ক্লান্ত হন, বিচ্ছুবাচ্চা সামলাতে গিয়ে বিরক্তির চূড়ায় ওঠেন, তার পরও এই রাস্তার সৌন্দর্য সব ভুলিয়ে দেবে। উঠলাম ক্যান্ডোলিম সৈকতের পাশের একটা অ্যাপার্টমেন্টে। আসবাবসহ বড় দুই কক্ষ, রান্নার সরঞ্জামের সঙ্গে ইনডাকশন কুকার—সব মিলিয়ে তোফা ব্যবস্থা। আমাদের এই ট্যুরের মূল থিম ছিল ‘শিশুই প্রথম’। মানে বাচ্চাকে কষ্ট দিয়ে ঘোরা নয়। পাঁচ দিন ভ্রমণে এক দিন ছাড়া প্রতিদিনই আমরা বেরিয়েছি দুপুর আড়াইটা-তিনটার দিকে। এর আগে বাচ্চার দুইবার খাওয়া, গোসল ও ঘুম হয়ে যেত। ফিরতাম ৮টা-৯টার মধ্যেই। সকালে আর রাতে রান্না করতাম, দুপুরে খেতাম বাইরে। মান্ডোবি নদী গোয়াকে দক্ষিণ ও উত্তর দুই অংশে ভাগ করেছে। রাজধানী পানজির পাশেই এই নদী, খানিক দূরে মিশেছে সমুদ্রে। আমরা ছিলাম উত্তরের ক্যান্ডোলিমে। অদ্ভুত সুন্দর এক সৈকত। ছোট অথচ পরিচ্ছন্ন। ভিড় অন্যান্য সৈকত থেকে কম। বিদেশিদের আনাগোনাই বেশি। আরব সাগরের তীরে গোয়ায় অসংখ্য সৈকত। তবে প্রতিটিই এতটা বৈচিত্র্যময় যে একঘেয়ে লাগে না মোটেও। উত্তর গোয়ার ক্যান্ডোলিম ছাড়াও ঘুরেছি জনপ্রিয় আরো তিন সৈকত—ক্যালাঙ্গুট, বাগা আর ভাগাতর সৈকত। বাগাটা দারুণ, এক পাশে পাহাড়। ভাগাতরের পুরো সৈকতে প্রচুর উঁচু-নিচু পাথর। উত্তরের আরেকটি জনপ্রিয় সৈকত আঞ্জুনা, সেখানে অবশ্য যেতে পারিনি। ভাগাতরের পাশেই ১৫১০ সালে তৈরি বিখ্যাত চাপড়া দুর্গ, যেখানে ‘দিল চ্যাহতা হ্যায়’-এর শুটিং হয়েছিল। দুর্গের ভগ্নদশা, তবে উঁচু থেকে সমুদ্র অসাধারণ। তিন দিকেই সাগর। গোয়ার আরেক বিখ্যাত দুর্গ আগুয়াডা। শত্রুদের হাত থেকে বাঁচতে যা পর্তুগিজরা তৈরি করেছিল ১৬৬২ সালে। তখন মারাঠা বিদ্রোহী আর ডাচরা প্রায়ই গোয়া আক্রমণ করত। তাদের প্রতিহত করতে একসময় ৮০টি কামান ছিল আগুয়াডায়! এই দুর্গের পাশেই ডলফিন বে। ছাউনিওয়ালা নৌকায় চড়ে মিনিট চল্লিশের ভ্রমণ। ডলফিন দর্শনের সঙ্গে খোলা সাগরে ভেসে বেড়াতে মন্দ লাগে না। গোয়ায় আছে ছোট ছোট রিসর্ট। প্রায় সবগুলোর সঙ্গেই সুইমিংপুল। যার পাশে শীত থেকে পালিয়ে আসা ইউরোপীয়রা দিনমান শুয়ে থাকে। গোয়ার প্রায় প্রতি গলিতেই একটা করে বড় মনিহারি দোকান থাকে, যেগুলোর মালকিন অবধারিতভাবেই হন বয়স্ক এক পর্তুগিজ মহিলা। আমাদের গলিতে যেমন ছিলেন মিস ম্যারি। ৪৫০ বছর গোয়া পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিল। ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার আরো এক যুগের বেশি পরে ১৯৬১ সালে স্বাধীন হয়। গোয়ার অফিশিয়াল ভাষা কোঙ্কন হলেও স্থানীয়রা হিন্দি, ইংরেজি বলে।ছোট বাচ্চা নিয়ে ঘুরতে বের হলে নানা ধরনের চিন্তা হয়। কিন্তু গোয়া এদিক থেকে দারুণ। খুবই শিশুবান্ধব। প্রতিটি সৈকতের সঙ্গেই আছে বাচ্চাদের খেলার পার্ক। সেখানে আছে বেশ কয়েকটি রাইড। যার সবই বিলকুল ফ্রি! প্রতিটি সৈকতেই সমুদ্রস্নান শেষে নামমাত্র মূল্যে স্নান ও পোশাক বদলানোর ভালো ব্যবস্থা আছে। ফেরার আগের দিন আমরা গিয়েছিলাম পুরনো গোয়া। শুরুতেই ব্যাসিলিকা অব বম জেসাস, যা ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই গির্জায়ই রাখা আছে জেসুইটদের [খ্রিস্টধর্মের একটি ভাগ] প্রধান সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের মৃতদেহ। ১৫৫২ সালে মারা যাওয়ার পর ভারতের জল-হাওয়ায় তাঁর মৃতদেহ এখনো থাকাটা বিস্ময়কর বৈকি। ১০ বছর পর পর একদিন তাঁর মৃতদেহ প্রদর্শন করা হয়। পাশেই আর্কিওলজি বিভাগের জাদুঘর। পর্তুগিজ উপনিবেশের তামাম নিদর্শন, যেখানে যত্ন করে রাখা আছে। এরপর ডোনা পাওলা। মান্ডোবি আর জুয়ারি নদী যেখানে সমুদ্রে মিশেছে, সেখানেই ডোনা-পাওলা যুগলের মূর্তি। কথিত আছে, পর্তুগিজ ভাইসরয় কন্যার সঙ্গে স্থানীয় ছেলে পাওলার অসম প্রেমের সলিলসমাধির স্মৃতি রাখতেই এ মূর্তি। ফেরার দিন বরাদ্দ ছিল প্রিয় ক্যান্ডোলিমের জন্য। এক প্লেট চাওমিন আর কফি নিয়ে সমুদ্রের সঙ্গে শেষ সন্ধ্যাটা কাটিয়েছি। তবে গোয়ায় সন্ধ্যাই শেষ নয়, রাতেই যেন আরো বেশি জমজমাট থাকে। রাস্তার ধারে, অলিতে-গলিতে পানশালাগুলো জেগে ওঠে। গিটারের টুংটাং আর নানা খাবারের ঘ্রাণ অন্য জগতে নিয়ে যায়। বড়দিনের রাত গোয়ায় কাটানোর স্মৃতি ভোলা কার সাধ্য।

Loading...