বাড়ি কলকাতা পয়লা বৈশাখ : রঙে রঙে কুমোরটুলিতে বর্ষবরণ, ভিড় জমেছে সাধারণ মানুষের

পয়লা বৈশাখ : রঙে রঙে কুমোরটুলিতে বর্ষবরণ, ভিড় জমেছে সাধারণ মানুষের

76
0

কলকাতা, ১৫ এপ্রিল : বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে কুমোরটুলি সেজে উঠেছে নতুন সাজে। বর্ষবরণের দিন কুমোরটুলিতে ভিড় জমেছে সাধারণ মানুষের। বর্ষবরণে সেজে ওঠার কারণ, দু’টি বেসরকারি সংস্থা এবং কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের তৈরি সংগঠন কুমোরটুলি আর্ট ফোরামের উদ্যোগে রবিবার থেকে শুরু হয়েছে ‘রং-মাটির পাঁচালি’ শীর্ষক কার্নিভ্যাল। ওয়ার্ল্ড আর্ট ডে এবং বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে এই উদ্যোগ। এই কার্নিভ্যাল চলছে সোমবারও। এখানকার ৩০ জন শিল্পী চিরাচরিত মূর্তি ও প্রতিমা তৈরির বাইরে এসে নানা শিল্পকর্ম তৈরি করে সাজিয়ে তুলেছেন কুমোরটুলি। পুরো পটুয়াপাড়াকেই রঙে রঙে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। সাধারণ প্রতিমা তৈরির পেশাদারি এবং জীবিকামুখী কাজের চাপে শিল্পীদের মধ্যে থাকা যে বহুমুখী নান্দনিক সত্ত্বা, তারই যেন প্রকাশ ঘটেছে সাজানো-গোছানো রঙিন কুমোরটুলিতে।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বড়বাজার অঞ্চলের আগ্রাসনের শিকার হয়ে উত্তর কলকাতার মৃৎশিল্পীরা শহর ছেড়ে চলে যান। কিন্তু কুমোরটুলির পটুয়ারা, যাঁরা গঙ্গামাটি সংগ্রহ করে মাটির পাত্র ইত্যাদি তৈরি করে সুতানুটি বাজারে (অধুনা বড়বাজার) বিক্রি করতেন, তাঁরা টিকে যান। পরবর্তীকালে তাঁরা ধনী সম্প্রদায়ের বাড়ির পূজার জন্য দেবদেবীর প্রতিমা তৈরি করতে শুরু করেন। এমন অনেকে কুমোরটুলির স্থায়ী বাসিন্দা আছেন, যাঁরা অন্তত তিন পুরুষ ধরে প্রতিমাশিল্পী হিসাবে কাজ করছেন। 
শুধু এখানকার শিল্পীরা নন, এই কার্নিভালে প্রতিভার স্বাক্ষর তুলে ধরেছেন পাভলভ হাসপাতালের দু’জন আবাসিক। বছর পঁচিশের টুকাই সাধুখাঁর আদি বাড়ি চেঙ্গাইলে। পরে খিদিরপুরে মায়ের সঙ্গে থাকতেন। সেখান থেকে তিন বছর ধরে পাভলভ মানসিক হাসপাতালে ভর্তি। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে নানা কর্মশালায় যোগ দিয়ে হাত পাকিয়েছেন চিনামাটির জিনিস তৈরিতে। তার পরে টান দিয়েছেন তুলিতেও। ‘ওয়ার্ল্ড আর্ট ডে’ উপলক্ষে কুমোরটুলিতে চলছে প্রদর্শনী ‘রং মাটির পাঁচালি’। সেখানে ডাক পেয়েছেন টুকাই আর সীতা মাইতি।
সীতা বয়সে টুকাইয়ের চেয়ে কিছুটা বড়। ৩৮-এর এই মহিলারও দু’বছর ধরে ঠিকানা পাভলভ মানসিক হাসপাতাল। স্বামীকে হারিয়েছেন। পরিবারের লোকজনও আর খোঁজ করেন না। নিজের মাধ্যমিক পড়ুয়া মেয়েটাও নাকি ভুলে গিয়েছে মাকে। মেয়েকে দেখাশোনা করেন সীতার ভাই। তিনি সুস্থ হওয়ার পরেও ভাই বা মেয়ে কোনও খোঁজ করেননি বলেই আক্ষেপ সীতার। পিংলার নয়াগ্রামের ১০ জন পটচিত্র শিল্পী। সাজাতে হাত লাগিয়েছেন আর্টের পড়ুয়া একাধিক কমবয়সি ছাত্রছাত্রী। আয়োজক সংস্থার অন্যতম কর্তা সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় বলেন, প্রথম বছর এই কার্নিভ্যাল আয়োজন করে আমরা এখানকার শিল্পী থেকে শুরু করে বাসিন্দা, সর্বোপরি সাধারণ মানুষের যে সাহায্য, সহযোগিতা পেলাম, তা অভিভূত হওয়ার মতো। প্রত্যেক বছর কুমোরটুলিতে এরকম আয়োজন যাতে করতে পারি, সেই চেষ্টা করব। 
সবে কাজে হাত পাকাচ্ছেন তরুণ শিল্পী বুবাই পাল। তিনি বলেন, এমন একটা আয়োজন হওয়ায় আমরাও প্রচলিত মূর্তি তৈরির বাইরে অন্য কিছু কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি। প্রত্যেক বছর হলে আরও ভালো কাজ করার উৎসাহ পাব। বছর তিন আগে এখানকার শিল্পী মিন্টু পাল দেশপ্রিয় পার্কে ’বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রতিমা’ তৈরি করে আলোড়ণ ফেলে দিয়েছিলেন। কুমোরটুলি সংস্কৃতি সমিতির অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা তিনি। প্রতিমা তৈরির জন্য প্রতি পুজোতেই তাঁর ডাক পড়ে নানা জায়গা থেকে। আর এক শিল্পী কুমোরটুলি প্রগতিশীল মৃৎ ও সাজশিল্পী সমিতির সম্পাদক অপূর্ব পাল। দু‘ভাই মিলে বাবার ‘কারখানা‘-র হাল ধরেছেন। জানালেন, “এমনিতে কুমোরটুলির শ্রমিকসংখ্যা শ তিন। তবে, পুজোর সময় আরও বেশ কয়েকশো শ্রমিক এখানে জড়ো হন। মাটি সংগ্রহ, শিল্পীর সহায়তা, প্রতিমা বহন-সহ নানা কাজে লাগেন এঁরা।” কুমোরটুলি মৃৎশিল্প ও সংস্কৃতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক রঞ্জিত সরকার বলেন, এবার সময় অল্প পাওয়া গিয়েছে। অন্নপূর্ণা ও বাসন্তী প্রতিমা সবার ঘর থেকে বেরনোর পর কয়েকটি ফাঁকা ঘরে তড়িঘড়ি সাজানোর কাজ করতে হয়েছে। ভবিষ্যতে হলে সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা আরও সংগঠিতভাবে এই আয়োজন করতে পারব বলে আশা করি।

Loading...