বাড়ি অন্যান্য নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা এক শব্দ চড়ক

নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা এক শব্দ চড়ক

206
0


তুহিন শুভ্র আগুয়ান;পূর্ব মেদিনীপুরঃ“পৃথিবী বদলে গেছে যা দেখি নতুন লাগে…..”।আনন্দ আশ্রম ছবিতে কিশোর কুমারের গাওয়া এই গান বর্তমান বাস্তব জীবনের এক বড় দৃষ্টান্ত।আজ থেকে বহু বছর আগে  কিশোর কুমারের গাওয়া এই গানে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বর্তমান বাস্তব জীবনের চিত্র।বর্তমানে প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে মানুষ তত উন্নত থেকে উন্নততর হয়ে উঠছে।আর এর সাথেসাথে বদল ঘটছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের রীতিনীতির।ফলে মানুষ হারিয়ে ফেলছে তার আদি পূর্বপুরুষদের প্রবর্তিত প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গুলিকে।যার মধ্যে এক অন‍্যতম সংস্কৃতি গ্রামবাংলার চড়ক উৎসব।চড়ক উৎসব নামটির মধ‍্যে কোথাও যেন লুকিয়ে রয়েছে এক পর্বের সমাপ্তি এবং অপর পর্বের সূচনার কথা।অর্থাৎ চড়ক উৎসব বাংলা বছরের একদম শেষ লগ্নে অনুষ্ঠিত হয় বলে এই উৎসবের মধ্যে সমাপ্তি এবং সূচনার মেল বন্ধন পাওয়া যায়।এককালে চড়ক মানেই ছিল মা,ঠাকুমাদের নিয়ে বছরের শেষদিন মেতে ওঠা স্হানীয় এলাকার চড়কের মেলাতে।কিন্তু এখন বর্তমান নতুন প্রজন্মের কাছে কোথাও যেন বদল ঘটেছে এই চিত্রের।তারা এখন এইসব ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিকে ভুলে সুধুই মেতে উঠেছে লম্বা ও চওড়া অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনের দিকে।যারফলে এই প্রজন্মের কাছে সমগ্র বিশ্বের তথ্য হাতের মুঠোয় চলে চলে এলেও তাদের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে একে অপরের প্রতি আন্তরিকতার।এক প্রজন্মের মানুষের কাছে চড়ক বলতে বোঝাতো বছরের শেষ দিন স্হানীয় চড়ক মেলায় গিয়ে চড়কগাছে ভীড় করার কথা।কিন্তু বর্তমান প্রজন্মকে চড়ক কি জিজ্ঞেস করা হলে তারা সাহায্য নেয় গুগলের।ফলে বলা চলে নতুন প্রজন্মের কাছে এই স্মার্টফোন গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিগুলি।ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়,১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামে এক রাজা প্রথম এই চড়ক পুজোর প্রচলন করেন।রাজ ও তার পরিবারের লোকজন এই পূজা আরম্ভ করলেও চড়কপূজা কখনও রাজাদের পূজা ছিল না।এটি ছিল হিন্দু সমাজের লোকসংস্কৃতি।পুজোর সন্ন্যাসীরা প্রায় সবাই হিন্দু ধর্মের কথিত নিচু সম্প্রদায়ের লোক।তাই এ পূজায় এখনও ব্রাহ্মনের প্রয়োজন পড়ে না।এই চড়কপুজোর অপর নাম নীল পুজাও বলা চলে।গম্ভীরাপুজো বা শিবের গাজন এই চড়কপুজোরই রকমফের।চড়ক পুজো চৈত্রসংক্রান্তিতে অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিবসে পালিত হয়।আগের দিন চড়ক গাছটিকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়।এতে জলভরা একটি পাত্রে শিবের প্রতীক শিবলিঙ্গ রাখা হয়,যা পুজারিদের কাছে ‘বুড়োশিব’ নামে পরিচিত।পতিত ব্রাহ্মণ এ পুজোর পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন।পুজার বিশেষ বিশেষ অঙ্গ হলো কুমিরের পুজো,জ্বলন্ত অঙ্গারের ওপর হাঁটা,কাঁটা আর ছুঁড়ির ওপর লাফানো, বাণফোঁড়া, শিবের বিয়ে, অগ্নিনৃত্য, চড়কগাছে দোলা এবং দানো-বারানো প্রভৃতি।সবমিলিয়ে চড়ক যতই ঐতিহ্য বিজড়িত হোক না কেন তা আজ বর্তমান নতুন প্রজন্মের কাছে শুধুই ব্রাত‍্য।মহিষাদলের এক উচ্চ-মাধ্যমিক ছাত্র সৌভিক সেনাপতি জানান,“আগে যখন ছোটো ছিলাম তখন মা-ঠাকুমাদের সঙ্গে চড়কের মেলায় যেতাম কিন্তু এখন আর তেমনভাবে যাওয়া হয় না।তবে এই চড়ককে আমরা যতই ভুলে যাইনা কেন এরমধ্যে রয়েছে প্রাচীন লোকসংস্কৃতির সংস্পর্শ।তাই আমি আগামী প্রজন্মদের আহ্বান জানাবো পুনরায় এই চড়ক উৎসবে মেতে ওঠার জন্য।”আগে প্রত‍্যেকটি গ্রামে গ্রামে বছরের শেষ দিন এই চড়ক উৎসব অনুষ্ঠিত হত।কিন্তু এখন তেমন আর দেখা যায় না।তবে খুব অল্প কয়েকটি স্হানে এই চড়ক উৎসব অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে তেমন একটা নতুন প্রজন্মদের ভীড় লক্ষ্য করা যায় না।সবমিলিয়ে বলাই যায় নতুন প্রজন্মের কাছে আজ চড়ক ব্রাত‍্য।তারা কবিগুরুর ভাষায় বলতে চায়,“আমরা নতুন যৌবনেরই দূত……”।

Loading...