বাড়ি ফিরে দেখা ধ্বংসের কবলে জয়দেব মন্দির

ধ্বংসের কবলে জয়দেব মন্দির

282
0

রাধামাধব মণ্ডল
অজয় তীরের চরণচারণ পদ্মাবতীর দেশ, বৈষ্ণব  কবি জয়দেব গোস্বামীর সাধন ক্ষেত্র। আর এই বৈষ্ণব মোহান্ত সাধক বৈষ্ণব গোঁসাইদের পাশাপাশি  বাউলচর্চার প্রাণকেন্দ্রও হয়ে উঠেছে সেই অতীতের সময় থেকেই।জয়দেব আজও সমানজনপ্রিয় বাউলের চর্চা এবং আখড়া ধারীদের সাধনার গানে। দেশবিদেশের হাজার হাজার মানুষ আজও মনের নেশায় ছুটে আসেন অজয় তীরের বীরভূমের জয়দেবে কেন্দুলিতে। আসেন বহু জানা অজানা বাউলের দলও। বাউলের টানেই আজও বিশ্বদরবারে সমান জনপ্রিয় অজয় পাড়ের বাউল তীর্থ জয়দেব- কেন্দুলি। শুধু বাউল কেন, বাউলের পাশাপাশি এখানে কীর্তন ও বৈষ্ণব কবির গীতগোবিন্দম্এর চর্চাও চলছে।   তবে সেই চর্চার ধারা ক্রমশ হারাতে বসেছে। জয়দেবে বৈষ্ণব কবি গীতগোবিন্দের গানের চর্চা টিকিয়ে রেখেছেন অনাথ বন্ধু ঘোষ, শান্তি রজক, লক্ষণ দাস বাউলরা। যদিও এপ্রজন্মের কেউ তেমন ভাবে আর গীতগোবিন্দের গানের চর্চায় আসছেন না।  তবুও সুপ্ত ভাবে অনেকে বীরভূমের এই জয়দেবেও নিয়মিত চলিয়ে যাচ্ছেন গীতগোবিন্দম্ গানের চর্চা। এখানকার  কিংবদন্তি গায়ক অনাথবন্ধু ঘোষ বাংলার একজন পরিচিত গীতগোবিন্দম্ গীতের প্রবাদ প্রতিম গায়ক। এছাড়াও এখানকার শিক্ষক, সংগঠক শান্তি রজক নিয়মিত বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন গীতগোবিন্দের গান। এই জয়দেবেরই হারানো গ্রাম মন্দিরাতে প্রাচীন বৈষ্ণব কবি জয়দেব গোস্বামী তাঁর শৈশবের সোনালি দিন গুলো কাটিয়ে, সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। বর্তমানে মন্দিরার সেই মন্দিরময় জন্ম গ্রাম অজয়ের করাল গ্রাসে গেছে হারিয়ে। তবে যুব রাজা লক্ষণ সেনের তৈরি করে দেওয়া রাধাবিনদের মন্দিরটি এখনও টিকে আছে। এখানে বসেই রচনা করেছিলেন অমর প্রেমগীতি কাব্য গীতগোবিন্দম্। এখানকার বাউলমেলা আজ সারা বিশ্বে জনপ্রিয় সাধন গানের মকর মেলা বলে। কবির শ্রাদ্ধ বাসরকে ঘিরে, নিম্বার্ক সাধুরা শেষ পৌষে এখানে শুরু করে ছিলেন মেলার। সেই স্মরণ মেলাকে ঘিরে আজও শেষ পৌষে লক্ষ লক্ষ মানুষ এসে জড়ো হয় অজয় তীরে। বর্তমানে সেই মেলার এখন পরিচিতি স্নানের মেলা বলে। এই মেলা, বর্তমানে মকর মেলা হয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে, স্থানীয় জেলা গুলোর মানুষদের মধ্যে। শেষ জীবনে কবি জয়দেব গোস্বামী, অজয় তীরের কেন্দুলি গ্রাম ছেড়ে বিন্দাবনে চলে যান তাঁর পূর্জিত রাধাবিনোদকে সঙ্গে নিয়ে। এবং সেখানেই নিম্বার্ক আশ্রমের দায়িত্ব নিয়ে, তাঁদের গুরু হয়ে, সেখানেই দেহরক্ষা করেন। সেই আশ্রমে রয়েছে কবির স্মরণে সমাধি মন্দির। আর জয়দেবে এলে দেখতে পাবেন কবির কর্ম তীর্থ ভূমি। নদীর ধারে সাধন মন্দির, কুশেশ্বর শিব মন্দির। যদিও কবির জন্ম গ্রাম মন্দিরা এখন চলে গেছে অজয় গহ্বরে। বসতবাটি, গৃহমন্দির সব, সেইসঙ্গে রাজা লক্ষণ সেন প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটিও চলে গেছে অজয় গহ্বরে। পরবর্তীকালে বর্ধমান রাজা কীর্তিচাদের মা ব্রজকিশোরী দেবী ১৬৯৬ খ্রিঃ বর্তমান পঞ্চ চূড়া মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, সর্বসাধারণের জন্য। সেখানে গড়জঙ্গল থেকে রাধামাধবকে এনে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কবির আমলেই নাথ যোগী ও সহজিয়া সাধকদের আগমন ঘটে জয়দেবে। ধীরে ধীরে কবির নামে বেশ কয়েকটি গ্রামের মধ্যে, কেন্দুলিগ্রামটি জয়দেব বলে পরিচিত হয়। তখন থেকেই শুরু হয় বাউলচর্চা জয়দেবের মাটিতে। তবে জানা যায়, তারও আগে এখানে বাউলদের রমরমা ছিল। পরম বাবাজী, পঞ্চানন ঠাকুর, সুবল দাস, ললিতা মাতা, জগৎ খ্যাপা, জগৎ খ্যাপি, মনহর খ্যাপা, পাগল রাম দাস, শক্তি খ্যাপা, চুরুক দাড়ি রাম দাস, হালাকাঁপা বাবা, মনোহর খ্যাপা, দাস রসময়, সুধীর দাস বাউল, তুলসী দাসী ও পায়েরের শম্ভু দাসরা যেমন ছিলেন, সে সময়ের জগৎজোড়া নামের সাধক বাউল। তেমনই এখানে থেকেছেন বাউল পূর্ণ দাসের মা ব্রজবাল দেবী ও বড় দিদি রাধারাণী দেবীও। বিশ্ব বাউল পূর্ণ দাসও রাজেন বাবুদের বাড়ির কাছে এই জয়দেবে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখনও অজয় নদের কোলে, রুপোলী বালিয়াড়িতে চলছে বাউল সাধনার নানান গুপ্তময় কর্মময় অধ্যায়। এই জয়দেবে রয়েছেন প্রবীণ বাউল বাঁকাশ্যাম দাস, থাকতেন তারক দাস বাউল এখন তাঁর দুই সুযোগ্য পুত্র কাঙাল ও সাধু জয়দেবে বসেই জয় করছেন বিশ্বকে। রয়েছেন তমালতলি আশ্রমে সুধীর বাউলের শিষ্য লক্ষণ দাস বাউল, উত্তম দাস বাউল, দূরে রামপুর মাঠে সাধন দাস বাউলের মনেরমানুষ আখড়ায় রয়েছেন বাউল সাধনা নিয়ে তম্ময় দাস বাউল। প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে ১৪০৯-১৪১০ বঙ্গাব্দে জয়দেবে প্রথম বাউলের মনেরমানুষ আখড়া করেন গুরু বাউল সাধন দাস ও গুরু মা মাকী কাজুমি। মেলার কয়েক দিন এখানেই বিশ্ব বাউলের হাট বসে, মাটির আসনে। এই বসন্তে মরা যৌবনহারা অজয়ের কোলে কোলে, দানব লড়ির দৌড়াত্ব। কান পাতলেই শোনা যায় ধর্ষিত অজয়ের কান্না, মিশছে গাবগুবিতে। গভীর রাতে এখনও জাগ্রত হয় কদমখণ্ডী মহাশ্মশান। আর তারই পাশে অবিরত খোল করতাল বাজিয়ে বৈষ্ণবসাধকরা গেয়ে চলেন জীবনপুরের গান। অনন্ত আত্মার গান ধ্বনিত হয়, মেঘবালির চড়ে। জয়দেবের একই অঙ্গে বাজে বাউলের গাবগুবি, ফকিরের ডুবকি আর বৈষ্ণবের খোল- করতাল। সেইসঙ্গে দূরে বাজে মুসলমানের মসজিদে আজানের সুর, যেন মহামিলনের আনন্দনিকেতন। ইতিহাস খ্যাত জয়দেবের রাধামাধবের মন্দিরের পাশ দিয়েই অবিরত ছুটে চলেছে ওভার লোডের বালি বোঝায় ভারি ভারি গাড়ি। ইতিহাস, পুরা তত্ত্ব কাঁপিয়ে দিয়ে সে গাড়ির পর গাড়ি, রাত দিন ছুটে চলেছে বীরভূমের দিক থেকে বর্ধমানের দিকে। বালি ঘাটের ইজারাদার রা তুলছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। সরকারি দলের ছত্রছায়াতে ক্রমশ ইতিহাসের প্রাচীন মন্দিরটি ধ্বংসের মুখে। যদিও ইতিহাসের এই জয়দেব মন্দির বলে পরিচিত মন্দিরটির সংরক্ষণ করেছে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের কলকাতা মণ্ডলী। তাহলে তারা কেন রাখছে না নজর? কি করছে জয়দেবের অঞ্চল সংস্কৃতি পরিষদ, ও সংস্কৃতি কর্মীরা। আশ্রম, আখড়াধারী বাউল, সাধকসহ সাধারণ মানুষের কাছেই বা এই নিয়ে ভাবনা কি। শেষ ইতিহাসের নিদর্শন টি ধ্বংসের কবলে, তা হলে আর কি দেখতে জয়দেবে আসবে সাধারণ মানুষ। যদিও আসার কথা, রাস্তা সরিয়ে আরও পশ্চিমে টিকরবেতা গ্রামের কাছে তৈরি হচ্ছে অজয়ের উপর ব্রিজ। তবে সে নির্মাণও শেষ হতে এখনও বছর দু’য়েক তো লাগবেই। ততদিনে জয়দেব মন্দির, ভারি লড়ির কম্পনে সম্পূর্ণ ধ্বংসের কবলে হারিয়ে যাবে। বর্ধমানের একটি সংস্থা “পাণ্ডুরাজা প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র” ও “সহজ সেবা ও সংস্কৃতি শিক্ষা মিশনে”র যৌথ উদ্যোগে মন্দির রক্ষায় আন্দোলন করার জন্য, আপামর জয়দেবের জনসাধারণের কাছে, সহযোগিতার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বীরভূমের জেলা প্রশাসন এবিষয়ে নিরব।

Loading...