বাড়ি ফিরে দেখা বাংলার ইতিহাসে বিজ্ঞান মনস্ক বিদ্যাসাগর

বাংলার ইতিহাসে বিজ্ঞান মনস্ক বিদ্যাসাগর

1876
0

রবীন্দ্রকুমার শীল – ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা আলোচনা করতে গেলেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা মনে পড়ে যায| তিনি যেভাবে বিদ্যাসাগরের চরিত্রকে সকলের সমানে তুলে ধরেছেন সেটা বোধ হয আর কারোর পক্ষে সম্ভব হযনি| তিনি তাঁর ‘চারিত্রপূজা’ গ্রˆন্থে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে লিখতে গিযে লিখছেন, ‘তিনি যে বাঙালি বড়োলোক ছিলেন তাহা নহে, তিনি রীতিমতো হিন্দু ছিলেন তাহাও নহে-তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বেশি বড়ো ছিলেন, তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন| বিদ্যাসাগরের জীবনীতে এই অনন্যসূলভ মনুষ্যত্বের ্প্রাচুর‌্যই সর্ব্বোচ গৌরবের বিষয|পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু মাত্র সংস্কৃˆত পণ্ডিত ছিলেন না| তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক এবং বিজ্ঞান মনস্ক ব্যক্তি| বিজ্ঞান ছাড়া বাংলার কুসংস্কার থেকে মুক্তি পাওযা একেবারে অসম্ভব সেটা অনুভব করতে পেরেছিলেন| সেই কারণে তিনি ইংল্যাণ্ডের শিল্পবিপ্লব এবং ইংরেজি ভাষার অন্যতম সেরা সমর্থক ছিলেন| পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষার পরিবেশ যত বেশি করে বাংলাকে ্প্রভাবিত করতে পারবে ততই বাংলার সামাজিক মুক্তি সম্ভব সেটা অনুভব করতে পারেন বিদ্যাসাগর| সেই কারণে তিনি ইংরেজি ভাষা থেকে বাংলায অনুবাদ করতে শুরু করলেন| অনুবাদ সাহিত্যের অন্যতম জনক হিসাবে তাঁকে গণ্য করা যেতেই পারে| পাশাপাশি তিনি বাংলার ইতিহাস রচনায মনোনিবেশ করেছিলেন| ইংরেজ জাতির ইতিহাস রযেে| কিন্তু বাংলা অতি ্প্রাচীন সভ্য দেশ হযে তার কোনও ইতিহাস নেই এটা সহজভাবে গ্রহণ করে নিতে পারেননি বিদ্যাসাগর মহাশয| সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায বাংলার ইতিহাস চাই বলে যে  স্লোগান তুলেছিলেন তাকে আগেই পথ দেখিযে নিযে গিযেিলেন বিদ্যাসাগর| বিদ্যাসাগরে পথকে অনুসরণ করে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায বাংলার ইতিহাস রচনার পক্ষে জোরদার সাওযাল করে যান| বঙ্কিমচন্দ্রের আগেই বাংলার ইতিহাস রচনায ব্রতী হযেিলেন সংস্কৃˆত পণ্ডিত বিদ্যাসাগর| শুধু  সংস্কৃˆত শিক্ষার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেন নি তিনি| বিজ্ঞান বিষযে যথেষ্ট সচেতন একজন পণ্ডিতও ছিলেন তিনি| পাশ্চাত্য বিজ্ঞান সম্পর্কে উচ্চ ধারনা ছিল| ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্কুলে স্কুলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা ও বিজ্ঞান চর্চার পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করে গিযেিলেন| ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায (যিনি তাঁর বিদ্যাবত্তার জন্য ্প্রাপ্ত উপাধি ‘বিদ্যাসাগর’ নামে সর্বত্র পরিচিত) ্প্রযাণের দু’দশক পরে আচার‌্য রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী লিখেছেন,-‘অনুবীক্ষণ নামে একরকম যন্ত্র আছে তাহাতে ছোট জিনিস বড় করিযা দেখা দেখায…| কিন্তু বিদ্যাসাগরের জীবন চরিত বড় জিনিসকে ছোট দেখাইবার জন্য নির্মিত যন্ত্রস্বরূপ|’ আচার‌্য ত্রিবেদীর মূল্যাযনকে স্মরণ করে আমরা এটা অনুভব করতে পারি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর কাজের জন্য সুনাম চাননি| তিনি চেযেিলেন কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে নির্মিত হোক| বিশাল এবং বিচিত্ৰ কর্মময জীবন ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরেৰ| তার জন্য তিনি কোনও সমযে কারোর কাছে বাহবা পাওযার জন্য অপেক্ষা করতেন না| এমনকী তিনি সরকার বাহাদুরের সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করতেন না| ইংরেজ সরকার বহুবার তাঁর কাছে উপযাচক হযে এসেছিল| ্প্রযোজন থাকলে সরকারের সহযোগিতা গ্রহণ করতেন| আর নাহলে সরকারের সহযোগিতাকে ্প্রত্যাখান করতেন| সরকার কোনও রকমভাবে অন্যায নীতি চালু করার চেষ্টা করলে তার তীব্র বিরোধিতা করতে দ্বিধা বোধ করতেন না| ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে সমীহ করে চলার চেষ্টা করতো ব্রিটিশ সরকার| সামাজিক সংস্কার যেমন- বিধবা বিবাহ ্প্রথা চালু, বহু বিবাহ রোধ, নারী শিক্ষা ্প্রচলন করার পাশাপাশি বাংলার ভাষার শিক্ষা ্প্রচলন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন| শিক্ষা ও বাংলা ভাষার আধুনিকীকরণের ্প্রযোজনীযতা উপলদ্ধি করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর| তিনি তাঁর একক ও কিছু সহযোগিতাদের উদ্যেগে রেখে যান একটি আধুনিক ব্যবহারযোগ্য ( উচ্চারণ আনুযাযী ও মুদ্রণ যোগ্য) বাংলা ভাষা, ্প্রাথমিক ও নীতিশিক্ষার বহু জন্প্রিয গ্রন্থ (যার অনেকটির জন্প্রিযতা একবিংশ শতকেও অব্যাহত) বাংলা মাধ্যম স্কুল ব্যবস্থা ও নারী শিক্ষার পাকা ৱুনিযাদ| এর পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস ও অন্যান্য বিষযে বেশ কযেটি অনুবাদ গ্রন্থ তথা যুগোপযোগী সংস্কৃˆত ব্যাকরণও রচনা করে গিযেেন| বস্তুত, তাঁর নির্মিত বাংলা ভাষার ভিত্তির ওপরেই ্প্রতিষ্ঠিত হযেে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ্প্রথম অধ্যায| তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের জীবন| জীবনের ্প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সংগ্রাম করে জযী হযেিলেন| তিনি জানতেন সত্যের জন্য সংগ্রাম করলে কোনও সমযে পরাজয হয না| তিনি বাংলাকে শিক্ষার আলোতে ভরিযে তোলার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গিযেিলেন| এর জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষাকে সাদরে গ্রহণ করতে কোনও কুণ্ঠাবোধ করেননি| তিনি ইউরোপের শিক্ষার পরিবেশকে বাংলায ্প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উত্গ্রীব হযে ছিলেন| তাঁর ্প্রতিষ্ঠিত বহু স্কুলে ইংরেজি ভাষা এবং আধুনিক বিজ্ঞান চর্চা ছাত্রদের শেখানো হতো| ২তাঁর নজর এড়াযনি, তা তাঁর পরবর্তী জীবনের ্প্রতিটি পদক্ষেপেই স্পষ্ট হযেে| ধুতি-চাদর ও চটি পরেও তিনি ছিলেন আপাতমস্তক যুক্তিবাদী মানবতাবাদের বিশ্বাসী-‘ ্প্রথা নিবদ্ধ আধুনিকতার ধারক ও বাহক’| সংস্কৃˆত কলেজের অতি তরুণ ছাত্রাবস্থায বিদ্যাসাগর নিশ্চয তাঁর পাশে বযে যাওযা ‘ঝড়’কে অনুভব ্প্রত্যক্ষভাবে করতে পেরেছিলেন| নিদারুণ দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করা গণ্ডগ্রাম থেকে আসা এই বালকটি ‘সমযে স্রোতে’ গা না ভাসিযে সংস্কৃˆত কলেজের পাঠক্রম নির্দেশিত বিদ্যায শ্রেষ্ঠত্ব লড়াই তাঁর জীবনের মুখ্য ব্রত বলে গ্রহণ করেছিলেন| লক, হিউম, রুশো বা টমাস পেইনের চিন্তাধারায উদ্বেলিত হযে তর্কে-বিতর্কে গা ভাসানোর বিলাসিতার সুযোগ ও সময, কোনওটাই তাঁর ছিল না| কিছু উন্মাদনার বাড়াবাড়ি বাদ দিযে ডিরোজিও অনুগামীদের মধ্যে যে যুক্তিবাদের পক্ষে ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ্প্রবল ঝোঁক, তাও যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১২ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে কৃত্বিতের সঙ্গে সংকৃত কলেজ থেকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন| ওই বছরের শেষ দিকে অর্থাত্ ২১ ডিসেম্বর ১৮২১ সালে কলকাতার ফোর্ট উইলিযাম কলেজে বাংলা বিভাগে ্প্রধান পণ্ডিতের (সেরেস্তাদার) পদে যোগ দিলে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের পদযাত্রা শুরু হয| ফোর্ট উইলিযাম কলেজের অধ্যক্ষ উইলিযাম কেরি বিদ্যাসাগরকে বাংলা ভাষায বই লেখার ব্যাপারে উত্সাহ দান করতেন| ইংরেজ সাহেবের বাংলা ভাষার ্প্রতি আন্তরিকতা বিদ্যাসাগরকে মুগ্ধ করেছিল| উইলিযাম কেরির বাংলা বাংলা ভাষার ্প্রতি তাঁর আন্তরিক ্প্রীতিবোধ বিদ্যাসাগরকে মুগ্ধ করে| ফোর্ট উইলিযাম কলেজের বাংলার ্প্রধান পণ্ডিতের পদ গ্রহণ করেই বিদ্যাসাগর সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, তিনি আজীবন বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য ্প্রচেষ্টা চালিযে যাবেন| বাংলা শিক্ষাক্ষেত্রের যুগসন্ধিক্ষণে বিদ্যাসাগরের অবির্ভাব| যদিও তাঁর শিক্ষা যাত্রাপথে বহু বির্তক ও দ্বিধা ছিল| তৱুও নানা বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হযেিলেন| ১৮০০ সালে ১০ জুলাই ্প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিযাম কলেজকে বড়লাট ওযেেসলি ‘ স্বপ্নের সন্তান’ হিসাবে ্প্রতিপালন করার চেষ্টা করেন| তিনি এই কলেজকে ‘্প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করুক এই ্প্রচেষ্টা চালান| বড়লাট ওযেেসলি চাইলেও ইস্ট ইণ্ডিযা কোম্পানির পরিচালকমণ্ডলী ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ সেটা করতে ইচ্ছা ্প্রকাশ করেনি ব্যয সাপেক্ষ শিক্ষা কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে| কোম্পানি চেযেিল ইংল্যাণ্ডই আমলাদের ্প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হোক| কিন্তু ধীরে ধীরে ভারতীয ভাষা ও চর্চার কেন্দ্র হিসাবে ফোর্ট উইলিযামের খ্যাতি ছড়িযে পড়তে শুরু করে| ১৮২৮ সালে লর্ড উইলিযাম বেন্টিঙ্ক ভারতের বড়লাট হযে এলেন| তিনি বরাবরই ্প্রাচ্যবিদ্যা কেন্দ্র ফোর্ট উইলিযামের বিরোধী ছিলেন| ১৮৩০ সাল থেকে এই কলেজের অর্থ বরাদ্দের উপরে বড়োসড়ো ‘কোপ’ নেমে আসতে শুরু করে| এই দিকে ১৭৮৪ সালে উইলিযাম জোন্স, এইচ জে কোলব্রুক ্প্রমুখের তত্ত্বাবধানে ‘এশিযাটিক সোসাইটি’  ্প্রতিষ্ঠা লাভ করে| ফোর্ট উইলিযাম কলেজের সঙ্গে শিক্ষা বিষযক ভাবধারার দিক দিযে এশিযাটিক সোসাইটির নিবিড় যোগ ছিল| জোন্সের পরে ্প্রিন্সেপ, লীডেন, উইলসন, হজসন ্প্রমুখ এই কলেজের ‘শিক্ষক, পরীক্ষক ও সিভিলিযন’ ছাত্র হিসাবে যুক্ত ছিলেন| ঠিক এই সময থেকে বিদ্যাসাগর স্বাধীনভাবে  বাংলা ভাষার উন্নতির করার জন্য স্বতন্ত্র পরিকল্পনা গ্রহণ করেন| ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পাঠ গ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যাসাগর হিন্দি শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করেন| হিন্দিতে রচিত ‘বেতাল পঁচেসী’ বাংলায অনুবাদ করে ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’  নাম দিযে গ্রন্থ ্প্রকাশ করেন| বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে অনুবাদের ওপরে জোর দিতে শুরু করেন| বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগরকে অন্যতম সেরা অনুবাদক বলে গণ্য করা যেতে পারে| তিনি বাংলায উচ্চাঙ্গের অনুবাদ সাহিত্য রচন করতে সক্ষম হন| বাংলা ভাষায অনুবাদ সাহিত্য রচনা করতে গেলে ইংরেজি ভাষার শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে সেটা অনুভব করতে সক্ষম হন| একদিকে চললো তাঁর সংস্কৃˆত ও ভারতীয দর্শন চর্চা এবং অন্যদিকে চলতে থাকলো তাঁর ইংরেজি ভাষার ওপরে শিক্ষা গ্রহণ| সাংখ্য দর্শন ও পুরাণ নিযে পড়াশুনা করতে শুরু করলেন বিদ্যাসাগর| সংস্কৃˆত কলেজের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে যেসব পুরাণ, সংস্কৃˆত সাহিত্য রযেে সেগুলো ধীরে ধীরে সব পড়ে ফেললেন তিনি| ফোর্ট উইলিযাম কলেজকে সামনে রেখে বাংলা ভাষা ও শিক্ষার উন্নযনের বাসনা সৃষ্টি হল তাঁর মনজগতে| বিদ্যাসাগর বাংলার স্কুলে ইংরেজি ভাষা চালু করা হোক বলে বহু সাওযাল করেছিলেন| রাজা রামমোহন রায এবং ্প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরও ইংরেজি ভাষার ্প্রতি আন্তরিকতা ্প্রদর্শন করেন| ইংরেজি ভাষা না শিখতেˆ পারলে আধুুনিক ভারত গড়ে তোলা একেবারে অসম্ভব সেটা অনুভব করতে সক্ষম হন বিদ্যাসাগর| সেই কারণে তিনি ইংরেজি ভাষা দক্ষ মাইকেলকে সমর্থন করে গিযেেন আজীবন| বাংলার আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টি করে গিযেিলেন মাইকেল| াশাপাশি বিদ্যাসাগর আবার ইংল্যাণ্ডের বিপ্লবকে সমর্থন করেন| ইংল্যাণ্ডের শিল্প বাংলায স্থাপিত হলে কর্মসংস্থান হবে এবং বহু বেকার সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে বলে মনে করতেন বিদ্যাসাগর|  ৩ইংল্যাণ্ডের শিল্প বিপ্লবের সুফল ভারতে স্থান গ্রহণ করুক এই অভিমত ্প্রকাশ্যে ্প্রচার করে বেড়াতেন বিদ্যাসাগর মহাশয| আধুনিক ভারত গড়তে আধুনিক শিল্প পরিবেশ তৈরি করার ্প্রযোজন রযেে সেটা ্প্রবলভাবে অনুভব করতেন বিদ্যাসাগর| নতুন বাংলা গড়তে বিদ্যাসাগর যেমন অগ্রসর হযেিলেন| ঠিক তেমনি তিনি নারী শিক্ষা ্প্রতিষ্ঠা করার ্প্রযোজযী়তা অনুভব করেন| নারী জাতিকে শিক্ষিত না করতে পারলে জাতির কোনও উন্নতি নেই সেটা তিনি উপলদ্ধি করতে সক্ষম হন| সেই কারণে তিনি বেথুন সাহেবের ্প্রতিষ্ঠা করা মহিলা স্কুলকে সমর্থন করে গিযেেন| বেথুন সাহেবের তৈরি করা মেযেের স্কুলের সভাপতি পদও অলঙ্কৃত করেন বিদ্যাসাগর মহাশয|  বিদ্যাসাগর অসুস্থ থাকার সমযে তাঁর বন্বু মদনমোহন তর্কালঙ্কার বিদ্যাসাগরের সামাজিক পরিকল্পনাকে বাস্তবাযিত করার দাযিত্ব গ্রহণ করেন| তিনি বিধবা বিবাহকে কার‌্যকর করেছিলেন| এমনকী বেথুন স্কুলে ছাত্রী পাওযা একেবারে অসম্ভব হচ্ছিল| রক্ষণশীল সমাজ বেথুন স্কুলে ছাত্রী পাঠানোর ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল| ফলে কোনও কোনও হিন্দু পরিবার তাদের বাড়ির মেযেে বেথুন স্কুলে ভর্তি করতে ভরসা পাচ্ছিল না| পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কার মহাশয নিজে এগিযে এসেছিলেন| ব্রাহ্মণ পণ্ডিত হযে তিনি বেথুন স্কুলে তাঁর নিজের দুই কন্যাকে ্প্রথম ছাত্রী হিসাবে ভর্তি করে দেন| সেই সমযে পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কারের উপরে সমাজ ক্ষিপ্ত হযে পড়েছিল| কিন্তু তিনি কোনও কিছুকে পরোযা না করে নিজে বেথুন স্কুলের ছাত্রীদের জন্য বর্ণপরিচয রচনা করেন| এমনকী বিদ্যাসাগরকে বেথুন স্কুলে সভাপতি করার পক্ষে সায দিযেিলেন বন্বু মদনমোহন তর্কালঙ্কার| কবিগুরু তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করতে গিযে লিখছেন,-‘মাঝে মাঝে বিধাতার নিযমের এরূপ আশ্চর‌্য ব্যতিক্রম হয কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চার কোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন, সেখানে হঠাত্ দুই একজন মানুষ গড়িযা বসেন কেন, তাহা বলা খুব কঠিন|’ ইংরেজ জাতির ইতিহাস রযেে| সেই কারণে ইংরেজ জাতি তাদের ঐতিহ্যকে নিযে অহংকার করতে পারে| কিন্তু বাংলার কোনও ইতিহাস সেই সমযে রচিত হযনি| একজন ইংরেজ ্প্রথম বাংলার ইতিহাস রচনা করতে উদ্যোগী হন তাঁর নাম জন ক্লার্ক মার্শম্যান| তিনি বাংলাদেশের তথ্য সংগ্রহ করে ইংরেজি ভাষাতে বাংলার ইতিহাস রচনা করতে সক্ষম হন| বিদ্যাসাগর সেই ইংরেজ পণ্ডিত মার্শম্যানের লিখিত ইংরেজি বইযে বাংলায অনুবাদ করে ্প্রথম বাংলার ইতিহাস রচনা করতে উগ্যোগী হযেিলেন| বিদ্যাসাগরের ্প্রদর্শিত পথ ধরেই সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায বাংলার ইতিহাস রচনা করতে উদ্যোগী হন| ইংরেজ পণ্ডিত জন ক্লার্ক মার্শম্যান এর রচিত ‘ঞ্জন্ডন্ঠ্ত্ত্ত্র দ্র্ ঃঠ্ত্র ছ্ন্ন্ঠদ্রা দ্র্ ঙ্কত্র্ত্বত্থ্ত্ত’ বইটির বাংলায অনুবাদ করে ্প্রথম বাংলার ইতিহাস সহজ ভাষায রচনা করার পথ তৈরি করে দিযে যান বিদ্যাসাগর মহাশয| ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ ্প্রকাশিত হয ১৮৪৮ সালে| যদিও এই বইযে ্প্রথম ভাগ কোনও দিনই ্প্রকাশ লাভ ঘটেনি| বিদ্যাসাগরের আগে এই গ্রন্থের অনুবাদ ্প্রকাশ করেছিলেন গোবিন্দ চন্দ্র সেন| তাঁর রচিত বইযে নাম ছিল ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’| গোবিন্দ চন্দ্র সেনের লিখিত বইযে বাংলা ভাষা অত্যন্ত জটিল থাকার ফলে বিদ্যাসাগর সহজ বাংলা ভাষায মার্শম্যানের বইটি  অনুবাদ করার ইচ্ছা ্প্রকাশ করেন| বিদ্যাসাগরের রচিত ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ গ্রন্থটি কাল শুরু হযেে সিরাজদৌল্লার বাংলা বিহার সিংহাসন আরোহনের কাল থেকে| সমাপ্ত হযেে ১৮১৩ সালের ৪ঠা অক্টোবর লর্ড মিন্টোর ভারত ত্যাগ পর‌্যন্ত| ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’কে সহজ বাংলা ভাষায সবার যাতে বোধগম্য হওযা সম্ভব হয তার জন্য চলিত ভাষা ্প্রযোগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন| যদিও সেই সমযে চলিত বাংলা ভাষায সাহিত্য রচনা করতে গেলে সমযে সমযে সংস্কৃˆত ভাষা সাহায্য নিতে হতো| বাংলা তখনও সংস্কৃˆত মুক্ত হতে পারেনি| স্বাধীনভাবে চলতে শেখেনি| তার উজ্জ্বল উদাহরণ সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যাযে রচিত গ্রন্থগুলো| কিন্তু বিদ্যাসাগর যতটা সম্ভব সহজ বাংলায বাংলার ইতিহাস রচনা করতে উদ্যোগী হন| বিদ্যাসাগরেৰ পথকে অনুসরণ করে বঙ্কিমচন্দ্র বাঙ্গালার ইতিহাস রচনায ব্রতী হন| বিদ্যাসাগর বাংলা ইতিহাসকে অনুবাদ করেছিলেন মাত্র| কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায রীতিমতো গবেষণমূলক বাংলার ইতিহাস রচনা করেন| বাংলা ইতিহাস রচনা করার যে ্প্রযোজনীযতা রযেে সেটা উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন বিদ্যাসাগর মহাশয| তারপরে তাঁকে অনুসরণ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায, আচার‌্য দীনেশচন্দ্র সেন, রমেশচন্দ্র দত্ত, রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায, নিশীথ রঞ্জন রায এর মতো আরও বহু ইতিহাসবিদেরা বাংলার ইতিহাস রচনা করতে এগিযে এসেছিলেন| বিদ্যাসাগর শুধু সাহিত্য রচনা করেই ক্ষান্ত ছিলেন না| তিনি ইংল্যাণ্ডের শিল্প বিপ্লবকে সমর্থন করে গিযেিলেন| বিলেত থেকে মুদ্রণ যন্ত্র নিযে এসেছিলেন| কলকাতায একটি ্প্রেস স্থাপন করেছিলেন| ৪সেখানে তাঁর লিখিত বইগুলো ছাপা হতো| বাংলায ব্রাহ্মরা ইংরেজদের উদার নীতিকে সমর্থন করে| রাজা রামমোহন রায, ্প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এমনকী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও ইংরেজি ভাষা এবং ইংল্যাণ্ডের শিল্প বিপ্লবের পৃষ্টপোষক ছিলেন| ফলে তাদের সঙ্গে হাত মিলিযে ইংরেজরা বাংলায শিল্প স্থাপন করতে উত্সাহী ছিল| বিদ্যাসাগর শুধু সংস্কৃˆত ভাষার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি| তিনি ইউরোপীয সভ্যতার বিকাশে বিজ্ঞানীদের অবদান সম্পর্কে যথেষ্ট ওযাকিবহাল ছিলেন| ইউরোপ থেকে ্প্রকাশিত সংবাদপত্র তিনি যেমন পাঠ করতেন পাশাপাশি তিনি ইউরোপের বহু ্প্রকাশিত বই সংগ্রহ করতেন| বিশ্ব বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে তাঁর একটি ভালো ধারনা ছিল| তাঁর রচিত ‘জীবন চরিত’ পাঠ করলেই ৱুঝতে পারা যাবে| ‘জীবন চরিত’ গ্রন্থে তিনি বাংলার পাঠকদের জন্য বিজ্ঞানী বলটিন জামিরে ডুবাল, লিনীযস, নিকলস কোপার্নিকস, গালিলিও, সর আইজাক নিউটন এবং সর উইলিযম হর্শল এর মতো বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীদের নিযে বিস্তারিত আলোচনা করে গিযেেন| বিদ্যাসাগরকে অনুসরণ করে পরবর্তীকালে শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায চৌধুরী, কবি সুকুমার রায এবং চিত্র রিচালক  সত্যজিত্ রায বিজ্ঞান নিযে চর্চা করে গিযেেন|   ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিজ্ঞান সাধক ছিলেন বলা যেতে পারে| যখন পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীেˆদর নিযে কেউ কোনও রকম কথা ভাবতে শেখে নি তখন তিনি বাংলায বিশ্ব বিজ্ঞানীদের নিযে জীবনী লিখতে শুরু করে দিযেিলেন তাঁর ‘জীবন চরিত’ গ্রন্থে| তিনি এর পথিকযত বলা যেতে পারে|  কলকাতা নিবাসী রাজেন্দ্র লাল দত্ত ছিলেন ভারতের ‘ফাদার অব হিমোপ্যাথিক’| তিনি ব্রিটেন থেকে হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে বহু গ্রন্থ নিযে এসে রীতিমতো চর্চা করতে শুরু করে দেন| তিনি আবার কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্রও ছিলেন| অ্যালোপাথি পড়াশুনা ত্যাগ করে হোমিওপ্যাথি নিযে গবেষণা করতে শুরু করেন| হোমিওপ্যাথির পথিকৃত হ্যানিম্যানকে নিযে চর্চা করতে শুরু করেন| সেই সমযে শরীরে সূচ ফোঁটাতে দ্বিধাবোধ করতে রক্ষণশীল সমাজের মানুষেরা| বিশেষ করে ঘরের মেযো বাইরে এসে কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হযে রোগ দেখানোর পক্ষে সায বিশেষ দিত না| তখন রাজেন্দ্র লাল দত্ত হোমিওপ্যাথি চিকিত্সা করে রোগীদের রোগ সারিযে দিতেন বিনা ইনজেকশনে| ১৮৬১ সাল থেকে রাজেন্দ্র লাল দত্ত হোমিওপ্যাথি চিকিত্সা করতে শুরু করেন কলকাতায| ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৬৩ সালে রাজেন্দ্র লাল দত্তের কাছে হোমিও চিকিত্সার সাহায্য নিযে সুস্থ হযে ওঠেন| তারপর থেকেই ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর হোিওপ্যাথি চিকিত্সার ওপরে বিশ্বাস রাখতে শুরু করেন| শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেবের পাযে রোগও সারিযে দিযেিলেন হোমিও চিকিত্সক রাজেন্দ্র লাল দত্ত| তাঁর ছাত্র ছিলেন ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার| মহেন্দ্রলালও  কলকাতা মেডিকেল কলেজের গুণী ছাত্র ছিলেন| ১৮৬০ সালে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে থেকে চিকিত্সা বিদ্যায সর্বোচ্চ সম্মান লাভ করেন| ১৮৬৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয এম ডি ডিগ্রি লাভ করেন| কলকাতা বিশ্ববিদ্যালযে দ্বিতীয এম. ডি মহেন্দ্র লাল সরকার এবং জগবন্বু বোস| ্প্রথম এম ডি ছিলেন চন্দ্র কুমার দে মহাশয| মহেন্দ্র লাল সরকার অ্যালোপ্যাথির সেরা চিকিত্সক হযে  পরবর্তীকালে কিন্তু তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিত্সায বিশ্বাসী হযে পড়লেন| হোমিওপ্যাথি চিকিত্সা করে খুব সুনাম অর্জন করতে সমর্থ হন| বিদ্যাসাগর মহাশয ডাক্তার মহেন্দ্র লাল সরকারকে অ্যালোপ্যাথিক চিকিত্সক থেকে হোমিওপ্যাথি চিকিত্সকে পরিণত করেছিলেন| হোমিওপ্যাথিক চিকিত্সায বিশ্বাস জন্মানোর পর আর ডাক্তার মহেন্দ্র লাল সরকার অ্যালোপ্যাথি চিকিত্সা জগতে ফিরে যাননি| তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিত্সক হিসাবে রিচিতি লাভ করেন| সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায, ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব এবং ত্রিপুরার মহারাজার হোমিওপ্যাথিক চিকিত্সক ছিলেন| মেডিকেল কলেজে পণ্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা শ্রেণিতে পরীক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হযেিলেন| চিকিত্সা বিজ্ঞানে বাংলা শ্রেণিতে ভর্তি হওযার জন্য একটি নির্দিষ্ট গাইড লাইন তৈরি করে দিযেিলেন বিদ্যাসাগর| ছাত্র ভর্তি করার ব্যাপারে চিকিত্সক মধুসূদন গুপ্তও বিদ্যাসাগরের পরামর্শ গ্রহণ করতেন| ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা ত্যাগ করে কারমাডে গিযে আশ্রয গ্রহণ করার সমযে তিনি হোমিওপ্যাথির মূল্যবান বই সঙ্গে করে নিযে গিযেিলেন| সেখানে সাঁওতাল পরগনায গিযে বসবাস করার সমযে হোমিও চিকিত্সা করতে শুরু করে দেন| সাঁওতালরাও সূচ ফোঁটানোর পˆক্ষপাতি ছিল না| তারা বিদ্যাসাগরের হোমিওপ্যাথি চিকিত্সায বিশ্বাসী হযে পড়ে| বিদ্যাসাগর মহাশয হোমিওপ্যাথিক চিকিত্সাকে তাদের মধ্যে ছড়িযে দিতে সক্ষম হযেিলেন| কারমাডে আদিবাসীরা বিদ্যাসাগরকে ‘ডাক্তারবাৱু’ বলে সম্বোধন করতো| তখন কারমাড ছিল বলতে গেলে ্প্রায ঘন জঙ্গল বসতি| সেখানে চিকিত্সার কোনও সুবন্দোবস্ত ছিল না| বিদ্যাসাগর কারমাডের আদিবাসী মহলে হোমিওপ্যাথি চিকিত্সাকে নিযে গিযে উপস্থিত করালেন| চিকিত্সা বিজ্ঞান সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট ওযাকিবহাল ছিলেন| এবং হোমিওপ্যাথি বই নিযে এসে চর্চা করতেন| ৫বিদ্যাসাগেরর জীবনটাই ছিল সংগ্রামের ইতিহাস| সারা জীবন ধরে সমাজের উন্নতির জন্য সংগ্রাম করে গিযেিলেন| বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য সংগ্রাম, নারী শিক্ষা ্প্রসারের জন্য সংগ্রাম, বিজ্ঞান শিক্ষা ্প্রচলন করার জন্য সংগ্রাম এবং চিকিত্সা বিজ্ঞানের ্প্রসার ও উন্নতির জন্য সংগ্রাম করে গিযেেন| বিদ্যাসাগরকে জীবন সংগ্রামী বীর পুরুষ বলে আখ্য দেওযা যেতেই পারে| আগামি দিনে শুরু হচ্ছে তাঁর জন্মের দ্বিশতবর্ষ| তাঁকে শ্রদ্ধা জানিযে এই ্প্রবন্ধের উপস্থাপনা| কবিগুরুর একটি কথা উল্লেখ করে এই মহান বীরপুরুষের কথা সমাপ্ত করবো-‘তিনি যেন সেন্যহীন বিদ্রোহীর মতো তাঁহার চতুর্দিককে অবজ্ঞা করিযা জীবনরণরঙ্গভূমির ্প্রান্ত পর‌্যন্ত জযধ্বজা নিজের স্কন্ধে একাকী বহন করিযা লইযা গেে

Loading...