বাড়ি ফিরে দেখা তিনদিন পর ১৮ আগস্ট স্বাধীন হয় নদিয়া

তিনদিন পর ১৮ আগস্ট স্বাধীন হয় নদিয়া

172
0

১৫ আগস্ট নয়, ১৮ আগস্ট আজকের দিনে স্বাধীন হয় নদিয়া জেলা। দেবাশিষ কংশবণিক, নবদ্বীপ। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার স্বাদ থেকে বঞ্চিত থাকে নদিয়াবাসী। ১৪ আগস্ট রাত ১২টা বাজতেই ইউনিয়ন জ্যাক নামিয়ে, আকাশে ওড়ে স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকা। ১৫ আগস্ট  যখন সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষ স্বাধীনতা দিবস পালন করছে , তখন নদিয়াবাসী তিনটি বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন “ভারত” না “পাকিস্তান” কোন দেশের অধীন হবেন তারা। সম্পূর্ণ ভারতভুক্তির মাধ্যমে তিনদিন পর ১৮ আগস্ট আজকের দিনে বর্তমান নদিয়া জেলার মানুষ স্বাধীনতা পেল। স্বাধীন হওয়ার পর প্রথমে জেলার নামকরণ হয়েছিল ‘নবদ্বীপ’ জেলা। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ‘নবদ্বীপ’ জেলার নাম পরিবর্তন করে পুনরায় ‘নদিয়া’ এবং ‘নদিয়া’ থানার নাম পরিবর্তন করে ‘নবদ্বীপ থানা’ রাখা হয়।১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে “ভারত স্বাধীনতা আইন, ১৯৪৭” পাশ হয়। এই আইনে ভারত ও পাকিস্তান দু’টি পৃথক দেশ গঠনের জন্য ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দিনটিকে সুনির্দিষ্ট ভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফকে চেয়ারম্যান করে, পাঁচজনের বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশন গঠন করা হয়। র‍্যাডক্লিফ ছাড়া কমিশনের বাকি চারজনই বিচারপতি ।  জাস্টিস বিজনকুমার মুখোপাধ্যায়, সিসি বিশ্বাস, আবু সালেহ মহম্মদ আক্রম এবং  এস এ রহমান। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই থেকে ১২ আগস্ট মাত্র ২৫ দিন কার্যকরী সময়ের মধ্যে অতি দ্রুততার সঙ্গে তাঁদের কাজ করতে হয়।
র‍্যাডক্লিফের রোয়েদাদ অর্থাৎ র‍্যাডক্লিফ তাঁর রোয়েদাদে যে সিদ্ধান্ত জানিয়ে মানচিত্র উপস্থাপন করেছিলেন সে সম্পর্কে অনেকেই ওয়াকিবহাল ছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে বর্তমান কালের মতো  শক্তিশালী গণমাধ্যমের অস্তিত্ব ছিলনা। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মুসলিম লীগ ১৫ আগস্ট সকাল থেকে বনগাঁ সহ চার জেলায় পাকিস্তানের পতাকা তুলে সভা-সমাবেশ করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে স্বাধীনতার আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন। মুসলিম লীগের পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন ও সভা-সমাবেশে সাধারণ মানুষ সহ বহু কংগ্রেস নেতা নেত্রীও বিভ্রান্তির শিকার হন। এই সময় নদীয়া জেলার সক্রিয় কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে ছিলেন, তারকদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, স্মরজিত বন্দ্যোপাধ্যায়, জগন্নাথ মজুমদার, শংকর দাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়, নৃসিংহপ্রসাদ সরকার, প্রফুল্ল ভট্টাচার্য, রনজিৎ পালচৌধুরি, হরিপদ চট্টোপাধ্যায়, পন্ডিত লক্ষ্মীকান্ত মৈত্র প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।স্বাধীনতার প্রাক্কালে অবিভক্ত নদিয়ার মহকুমা ছিল পাঁচটি। কৃষ্ণনগর সদর মহকুমা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, রানাঘাট। ১৯৪৭ সালের ১২ আগস্ট রাতে রেডিওতে ঘোষণা হয়, ভারতবর্ষকে স্বাধীনরাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা হবে এবং নদিয়া জেলা পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে পড়েছে। ভারতপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি নদিয়ার মহারানী জ্যোতির্ময়ী দেবী, মুর্শিদাবাদের রানী স্বর্ণময়ী দেবী সহ নানাস্তরের সামাজিক ব্যক্তিত্বরা মাউন্টব্যাটন সহ ব্রিটিশ প্রশাসকদের কাছে বনগাঁ সহ নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দিনাজপুর জেলার ভারতভুক্তির জোরালো দাবি তুলে ধরেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট চক্রবর্তী রাজা গোপালচারী গভর্নর অব বেঙ্গল পদে আসীন হন। তাঁর কাছে দরবার করতে, কলকাতা থেকে দিল্লী প্রশাসনিক চিঠি আদান প্রদানের পর, ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট বিজ্ঞপ্তি জারি করে বনগাঁ সহ চারটি জেলার অবস্থান পরিষ্কার করে দেওয়া হয় ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট বিজ্ঞপ্তি নম্বর ৫৮ জি এ বলে ১৮৯৮ সালের আগের সমস্ত বিজ্ঞপ্তি বাতিল করে, র‍্যাডক্লিফের রোয়েদাদ অনুকরণে ‘নবদ্বীপ’ জেলা গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। সে সময়ে নবদ্বীপ’ জেলার অধীনে কৃষ্ণনগর সদর মহকুমা ও রানাঘাট মহকুমা অন্তর্ভুক্ত হয়। ঐ দু’টি মহকুমার অধীনে কৃষ্ণনগর, কোতয়ালী, চাপড়া, কালীগঞ্জ, নদিয়া, নাকাশিপাড়া, কৃষ্ণগঞ্জ, করিমপুর, তেহট্ট, রানাঘাট, শান্তিপুর, চাকদহ, হরিনঘাটা, হাঁসখালী থানা এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট সরকারি বিজ্ঞপ্তির কথা সংবাদ রেডিওতে ঘোষণা করা হয়। ১৮ আগস্ট সংবাদপত্রের শিরোনাম – ‘নদিয়ার’ রানাঘাট ও কৃষ্ণনগর ভারতভুক্তি হল। কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা পাকিস্তানের’। ১৯৪৭ সালের ১৮ আগস্ট নবদ্বীপ সহ জেলার সর্বত্র বিজয় মিছিল হয়। চাকদহে নেতৃত্ব দেন, নাদু মিঞা। পুরসভা সংলগ্ন বসন্ত স্মৃতি পাঠাগারের সামনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। কৃষ্ণনগর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠ ও টাউন হলে, কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘যেদিন সুনীল জলধি’ সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করেন, শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারের শিল্পীরা। পলাশী এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকায় ২০ আগস্ট তারকদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে , পলাশী বাজার থেকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ মিছিল সহযোগে পলাশী মনুমেন্টে পৌঁছে সভা করেন এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। প্রবীণ সাহিত্যিক সুধীর চক্রবর্তী নবদ্বীপের একটি আলোচনা সভার প্রাক্কালে কথা প্রসঙ্গে বলেন, সে সময় আমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। ১৭ই আগস্ট খাওয়া-দাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ মাঝরাতে চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায়। জানালা খুলে দেখি লরি ভর্তি করে ও পায়ে হেঁটে স্থানীয় মানুষ আনন্দে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। তিনদিন পাকিস্তানে থাকার পর, পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে ওঠে চরকা চিহ্ন যুক্ত তেরঙা ভারতের  পতাকা। ফলে মুসলিম লীগ কর্তৃক র‍্যাডক্লিফের রোয়েদাদের সীমানা নির্দেশক মানচিত্রের অপব্যাখ্যার ফলে নদিয়ার ভারতভুক্তি হয় ১৯৪৭ সালের ১৮ আগস্ট ‘নবদ্বীপ’ জেলা হিসাবে।১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির বিজ্ঞপ্তি নম্বর ৫৪৫ জিএ অনুযায়ী ‘নবদ্বীপ’ জেলার নাম পরিবর্তন করে ‘নদিয়া’ জেলা রাখা হয়। ঐ দিনই বিজ্ঞপ্তি নম্বর ৫৪৬ জিএ ‘নদিয়া’ থানার নাম পরিবর্তন করে ‘নবদ্বীপ’ থানা রাখা হয়।

Loading...