বাড়ি অন্যান্য গ্রাম থেকে এসেছেন ঢাকীরা, চিন্তা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার

গ্রাম থেকে এসেছেন ঢাকীরা, চিন্তা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার

57
0

কলকাতা, ৩ অক্টোবর : মাঠে কাশফুল, আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ আর শিউলির গন্ধ। জানান দিচ্ছে পুজো এসে গিয়েছে। আজ পঞ্চমী। সকাল হতেই মন্ডপে মন্ডপে মানুষের ঢল। আর ঢাকের আওয়াজে মাতোয়ারা শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর।
এর মধ্যেই আশঙ্কার মেঘ— ওদের পরের প্রজন্ম বাপ-পিতামহের পেশায় আগ্রহী নয়।  তাহলে কি হারিয়ে যাবে বাংলার ঢাক? খোকন নাট্য, শঙ্কর দাস, অমল দাস, তপন নাট্য— পুজোর মুখে এই সময়টা ওঁদের মনখুশ। ঢাকের বোল শোনানোর পাশাপাশি কিছু উপার্জন। আনন্দ তো হবেই। সেই সঙ্গে গভীর শঙ্কা— কী হবে পরবর্তী প্রজন্মের? 
বছর ৪১-এর খোকনবাবুর বাড়ি ঘোলা- সোদপুরে। দুই ছেলে, ছোটজন পড়ে ক্লাশ থ্রি-তে। বড়জন মাধ্যমিক দেবে। না, ওদের কেউ আসবে না ঢাকীর পেশায়— এই প্রতিবেদককে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন টানা দু’দশকের ‘ঢাকী‘ খোকন নাট্য। যুগবেড়িয়ার বছর ষাটের শঙ্কর দাস গতবারের পুজোয় গিয়েছিলেন বাঙ্গালুরু। পাঁচ দিনের দক্ষিণা পেয়েছিলেন ১৯,৫০০ টাকা। সঙ্গে যাতায়তের ভাড়া। এ বার ২ অক্টোবর যাচ্ছেন লখনউ। ঢাক বাজাচ্ছেন সিকি শতকের ওপর। দুই ছেলের বড়জন গাড়ির চালক, ছোটজন কারখানার শ্রমিক। না ওদের কেউ আগ্রহী নন ঢাকের ব্যাপারে— জানালেন শঙ্করবাবু।  

যুগবেড়িয়ার ৫১ বছরের অমল দাস ঢাক বাজাচ্ছেন প্রায় দেড় দশক ধরে। দুই ছেলের বড়জন বিএ পাশ। ছোট ছেলে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ। এই প্রতিবেদককে অমলবাবু জানান, না ওরা এই পেশায় আগ্রহী নয়। পরবর্তী প্রজন্মের ঢাকের প্রতি অনীহার কথা কবুল করলেন ঘোলা-নাট্যপাড়ার পিসি রোডের ঢাকি তপন নাট্যও। ২২ বছর ধরে ঢাক বাজাচ্ছেন উনি। 
এই ঢাকিরা প্রত্যেকেই বছরভর নানা রকম কাজ করেন। প্রতি বছর দুর্গাপুজোর মুখে আসেন রাজ্যের  তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের ডাকে বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মান অনুষ্ঠানে। নৈপুন্য দেখানোর এই সুযোগ এবং মাসিক ভাতার জন্য ‘দিদি’-র কাছে ওঁরা কৃতজ্ঞ। প্রত্যেকের গলায় ঝুলছে ল্যামিনেটেড পরিচয়পত্র। ২০১৫-র ১ এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে পাচ্ছেন এক হাজার টাকা ভাতা। “আগে তো আমাদের দিকে কেউ তাকাত না“— খেদের সঙ্গে প্রায় সমস্বর ওঁদের। কিন্তু প্রদীপের নিচেই কি অন্ধকার? ছেলেমেয়েরা যদি ঢাকে আগ্রহী না হয়, পূর্বপুরুষদের ধারা কে বয়ে নিয়ে যাবে? বাংলার ঢাকের বোল যুগ যুগ ধরে মাতিয়েছে পশ্চিমী দুনিয়াকেও। সেটা কি চলে যাবে নিছক ইতিহাসের পাতায়? প্রশ্নের উত্তর নেই খোকন নাট্য, শঙ্কর দাস, অমল দাস, তপন নাট্যদের।

Loading...