বাড়ি সম্পাদকীয় কথা সাহিত্যিক শরত্ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায বলতেন, ‘গণিতবিদ কেশবচন্দ্র নাগ হচ্ছেন গণিতশিল্পী|

কথা সাহিত্যিক শরত্ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায বলতেন, ‘গণিতবিদ কেশবচন্দ্র নাগ হচ্ছেন গণিতশিল্পী|

418
0
  আমরা যেমন কথাশিল্পী হিসাবে বাংলার পাঠকদের কাছ থেকে সুনাম অর্জন করেছি| ঠিক তেমনি কেশববাৱু ছাত্রদের কাছে গণিতশিল্পী হিসাবে খ্যাতিলাভ করেছেন| গণিতশিল্পী আখ্যাটি কেশবচন্দ্র নাগকে দিযেিলেন কথাশিল্পী শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায| ছাত্রদের কারোর কারোর কাছে তিনি কে সি দাসের রসগোল্লার মতো মিষ্টি ছিলেন| আবার কোনও কোনও ছাত্রদের কাছে  কে সি পালের ছাতার বাঁটের মতো শক্ত| কে সি নাগের অঙ্ক একটা দিকে ছিল শাস্তি| আবার সেই অঙ্কের সমাধান নিজের হাতে কষা যেন অ্যাচিভমেন্ট|
প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অমল রাযচৌধুরী বলতেন, ‘কে সি নাগ সৃষ্টি না হলে বাঙালির ছেলেমেযো বিজ্ঞান সম্পর্কে জ়ডতা এসে যেত| কে সি নাগের অঙ্ক ছাত্র জীবনকে শক্ত ভিতের ওপরে দাঁড় করিযে দিতে সক্ষম হযেিল যার ওপর নির্ভর করে ছাত্ররা তাদের ভবিষ্যতকে পরিচালনা করতে সক্ষম হয| বিদেশে বহু বাঙালি ছাত্র রযেে যারা কে সি নাগের বই পড়ে অঙ্ক শিখেছে| আজকে তারা জটিল অঙ্কের সমাধান করতে সক্ষম হচ্ছে কে সি নাগের অঙ্কের বই পড়ার দৌলতে| তাদের গোড়াটা শক্ত করে দিযে গিযেিলেন কে সি নাগ|
স্বামী বিবেকানন্দ যে বছর শিকাগো ধর্মসভায বিশ্ব জয করলেন, সেই বছরই হুগলির গুড়াপের নাগ পাড়ায কে সি নাগের জন্ম| ১৮৯৩ সালের ১০ জুলাই| সেদিনটি ছিল আবার রথযাত্রা| তাঁর পিতা রঘুনাথ নাগ সন্তানের নাম রাখলেন ‘কেশবচন্দ্র’| শৈশবে পিতৃহারা হলেন কেশবচন্দ্র| মাতা ক্ষীরোদা সুন্দরী দেবী কিশোর কেশবকে মানুষ করতে কঠিন লড়াই শুরু করলেন|
গুড়াপে বেশি স্কুল তখন ছিল না| সেখানে একটি মাত্র স্কুল| নীলমনি স্কুলে ভর্তি হলেন কেশব| পরে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলেন ভস্তারা যোগেশ্বর হাই স্কুলে| বাড়ী থেকে এই স্কুলের দূরত্ব ছিল তিন মাইল| ভোররাত থেকে হাঁটতে শুরু করতেন কিশোর কেশব স্কুলে যাওযার জন্য| আবার স্কুল ছুটি হলে বাড়ী ফিরতেন সূর‌্য তখন পশ্চিম পাটে চলে গিযেে| নবমশ্রেনিতে কিষেনগঞ্জ হাই স্কুলে ভর্তি হলেন| প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করলেন কলকাতার রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে ১৯১২ সালে| ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন আইএসসি’তে|
দারিদ্রের সঙ্গে সংগ্রামে করতে গিয়ে তিনি যোগেশ্বর স্কুলের থার্ড মাস্টারি করতে শুরুর করলেন| কিন্তু সামান্য মাইনেতে বড় সংসার চলে না| পাশাপাশি তিনি টিউশনি করতে শুরু করলেন| উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন| বিজ্ঞান শাখায ভর্তি না হযে তিনি অঙ্ক, সংস্কৃˆত এবং কলা বিদ্যায ভর্তি হলেন| বিএ পাশ করলেন| এরপরে কিষেনগঞ্জ স্কুলে গণিতের শিক্ষকতা করতে শুরু করলেন| মাস্টারি করেছিলেন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিযে স্কুলেও| এই সময থেকেই তিনি গণিতের বিষযে ধ্যান জ্ঞান দিতে শুরু করেন| ছাত্রদের অঙ্কের ভীতি দূর করার জন্য তিনি গণিতকে আর প্রাঞ্জল করে তোলার চেষ্টায রত থাকলেন| তাঁর পড়ানোর খ্যাতি  ছড়িযে পড়লো সারা বাংলায| স্যার আশুতোষ মুখার্জি অঙ্কের ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর প্রিয বিষয ছিল গণিত| তিনি শিক্ষক কেশবচন্দ্র নাগকে ভবানীপুর মিত্র ইন্সটিটিউটশনে নিযে এলেন| সেখান থেকে প্রধান শিক্ষক হযে অবসর গ্রহণ করেন কেশবচন্দ্র|
কলকাতায এসে রসা রোডে একটি ভাড়া ঘর নিযে থাকতেন| পরে দক্ষিণ কলকাতায গোবিন্দ ঘোষাল লেনে বাড়ি করেছিলেন| মিত্র স্কুলে অগ্রজ শিক্ষক ছিলেন কবি কালিদাস রায| তাঁর বাড়িতে সাহিত্যিকদের আড্ডা বসতো| সেখানে মধ্যমনি ছিলেন কথা সাহিত্যিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায| এই সাহিত্যিকদের আড্ডাখানায কে সি নাগ উপস্থিত থাকতেন| কবি কালিদাস রায এবং কথা সাহিত্যিক শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায  অঙ্কের বই রচনা করতে কে সি নাগকে উত্সাহিত করেছিলেন| এর ফলে ‘ইউ এন ধর’ থেকে প্রকাশিত হল ‘নব পাটীগণিত’| বই প্রকাশিত হওযার পর থেকেই কেশবচন্দ্র নাগ থেকে কে সি নাˆগ হিসাবে পরিচিতি লাভ করলেন|
ক্যালকাটা ৱুক থেকে প্রকাশিত হল ১৯৪২ সালে ‘ম্যাট্রিক ম্যাথামেটিকস’| কীভাবে অঙ্ক করলে সুবিধা হবে ছাত্রেˆদর সেই পদ্ধতি এই বইটিতে লিখিত আছে| বিভিন্ন ভাষায কে সি নাগের বই প্রকাশিত হযেে| পাকিস্তান বোর্ডের জন্য বই লিখেছিলেন তিনি| আছে ব্রেল সংস্করণও|
গণিতের বইরে বহু আধ্যাত্মিক গ্রন্থও রচনা করেছিলেন| জিতেন্দ্রলাল রায ছিলেন তাঁর পাড়ার বন্বু| পরে যিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ বিশুদ্বানন্দ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন| তাঁর নির্দেশ কেশববাৱু খুব পালন করতেন| শ্রীশ্রী সারদা মাযে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন কে সি নাগ|
স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছিলেন| মহাত্মা গান্ধিজির ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করে কারাবাস বরণ করেছিলেন| পরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায তাঁকে ভোটে দাঁড়ানোর প্রস্তাব দিযেিলেন| কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি| খেলাধূলার প্রতি তাঁর আকর্ষন ছিল| ফুটবল, ক্রিকেট এবং টেনিস খেলার প্রতি তাঁর আগ্রহ দেখা যায| তিনি মোহনবাগান ক্লাবের সমর্থক ছিলেন| তাঁর অতি প্রিয ছিল আইএফএ শিল্ড এর খেলাগুলি| ১৯৮৫ সালে ১ ফেব্রুযারি কানপুরে ভারত ইংল্যাণ্ড টেস্টে ভারতের ক্রিকেট খেলোযাড় মহম্মদ আজাহারউদ্দিন তৃতীয শতরান এর ধারাবিবরণী শুনতে শুনতে মস্তিকে রক্তক্ষরণ হয| এর দুই বছর বাদে ১৯৮৭ সালে ৬ ফেব্রুযারি পরলোকগমন করলেন গণিতশাস্ত্রজ্ঞ|
তাঁর ছাত্রদের তালিকায আছেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায, সুভাষ মুখোপাধ্যায, হেমন্ত মুখোপাধ্যায, বিকাশ রায, রঞ্জিত মল্লিকের মতো দিকপালরা| তাঁর বই বিক্রির টাকা চলে যায তাঁর স্ত্রী লক্ষীমণি দেবীর ফাণ্ডে| সমাজ সেবার কাজে ও দরিদ্র ছাত্রদের পড়াশুনার জন্য সেই টাকা ব্যবহার করা হযে থাকে| তিনি সারা জীবন ছাত্রদের কল্যাণের জন্য জীবনকে উত্সর্গ করেছিলেন| বইতে তিনি তাঁর নামের পাশে কোনও দিন ডিগ্রির কথা উল্লেখ করেননি| শুধু লিখতেন কে সি নাগ| চেনা বামুনের পইতে লাগে না বলে তিনি মনে করতেন| আজকের প্রচার সর্বস্ব যুগে তাঁর মতো বিরল ব্যক্তির অভাব রযেে|
Loading...